বল বয় থেকে জাতীয় তারকা:তামিম-আশরাফুলদের পুরোনো প্রথা ফিরছে।
বল বয় থেকে জাতীয় তারকা:তামিম-আশরাফুলদের পুরোনো প্রথা ফিরছে। ছবি: সংগৃহীত

একসময় ক্রিকেট মাঠের একেবারে প্রান্তে, দর্শকদের চোখের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরদের বলা হতো বল বয়। বাউন্ডারির বাইরে থেকে বল কুড়িয়ে মাঠে ফেরত দেওয়ার এই দায়িত্ব দেখতে ছোট হলেও অনেকের জীবনে এটি হয়ে উঠেছিল বড় স্বপ্নের সূচনা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সেই বল বয়দের মধ্য থেকেই পরবর্তীতে উঠে এসেছেন একাধিক তারকা।

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল, ওপেনার শাহরিয়ার নাফিস কিংবা বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল—তাদের শুরুর গল্পে রয়েছে এক অভিন্ন অধ্যায়, সবাই কোনো না কোনো সময় ছিলেন বল বয়।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়। ঢাকা স্টেডিয়ামের পূর্ব-উত্তর কোণে অনুশীলন করত অংকুর ক্রিকেট একাডেমির কিশোরেরা। কোচ ওয়াহিদুল গনির তত্ত্বাবধানে অনূর্ধ্ব-১৩ ও অনূর্ধ্ব-১৪ বয়সী ক্রিকেটাররা দিনের বড় অংশ কাটাত অনুশীলনে। ম্যাচ থাকলে সেই তারাই হয়ে যেত বল বয়।

ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আসর—সব জায়গায় তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ইন্ডিপেনডেন্স কাপ ১৯৯৭, এশিয়া কাপ ১৯৯৮ কিংবা ১৯৯৮ সালের মিনি বিশ্বকাপ—এসব বড় টুর্নামেন্টেও বল বয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন আশরাফুল ও নাফিসরা। মাঠের খুব কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখা, বড় ক্রিকেটারদের অনুশীলন পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছিল তাদের ক্রিকেটবোধ।

চট্টগ্রামেও ছিল একই চিত্র। ১৯৯৮ সালে ইংল্যান্ড ‘এ’ দলের বাংলাদেশ সফরের সময় একটি তিন দিনের ম্যাচে বল বয়ের দায়িত্বে ছিলেন কিশোর তামিম ইকবাল। সেই ম্যাচেই সেঞ্চুরি করে জাতীয় দলে জায়গা করে নেন হাবিবুল বাশার। মাঠের পাশ থেকে সেই দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তামিমও।

সম্প্রতি এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল জানিয়েছেন, দেশের ক্রিকেটে আবারও বল বয় প্রথা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে বোর্ড নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার পাশাপাশি এই উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

তামিমের মতে, বল বয় হিসেবে মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা তরুণদের মধ্যে ক্রিকেটার হওয়ার তাগিদ তৈরি করে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ, এমনকি কখনো কখনো নেটে বল করার সুযোগ—সবই তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করে।

এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন মোহাম্মদ আশরাফুলও। তিনি জানান, নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বল বয় হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং অংকুর একাডেমিতে অনুশীলন তার ক্যারিয়ারে বড় ভূমিকা রেখেছে।

আশরাফুল বলেন, “আমরা অনেক সময় বড় ক্রিকেটারদের নেটে বল করার সুযোগ পেয়েছি। এতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।”

একটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ১৯৯৮ সালের এক অনুশীলনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ক্রিকেটার ফিল সিমন্সকে গুগলি দিয়ে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। পরে সিমন্স তাকে আলাদা করে ডেকে গুগলি অনুশীলনের পরামর্শ দেন।

আশরাফুল মনে করেন, বল বয় প্রথা তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটাররা মাঠের খুব কাছ থেকে খেলা দেখার সুযোগ পেলে তাদের মধ্যে বড় হওয়ার স্বপ্ন আরও জোরালো হয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে আবারও মাঠের প্রান্তে দেখা যেতে পারে কিশোর বল বয়দের। আর সেই কিশোরদের মধ্য থেকেই হয়তো তৈরি হবে আগামী দিনের নতুন আশরাফুল, তামিম বা নাফিস।