ভারত, পাকিস্তান, টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ
হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচটি দেখতে সারাদেশের মানুষ টিভির পর্দায় চোখ রাখবেনছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার এই ভারত-পাকিস্তান দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বাড়তে থাকা রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে খেলার মাঠেও। কয়েক দশকের পুরনো এই ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন মাঠের ভেতরে ও বাইরে এক কদর্য রূপ নিয়েছে। প্রথাগত করমর্দন বা হ্যান্ডশেক এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং হালকা মেজাজের ঠাট্টার জায়গা দখল করেছে গত মে মাসের সশস্ত্র সংঘাতের ইঙ্গিতপূর্ণ বিতর্কিত অঙ্গভঙ্গি।

সীমান্তের দুই প্রান্তেই রাজনীতি এবং খেলাধুলার সীমারেখা আজ অস্পষ্ট। এই ম্যাচগুলো এখন জাতীয়তাবাদী গর্বের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে, যা মাঝেমধ্যে রুচিহীনতার পর্যায়ে চলে যায়। তবে পাকিস্তানে ম্যাচ-পূর্ববর্তী সেই উগ্র দেশপ্রেম এবার খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। এর জায়গা নিয়েছে সমর্থকদের চরম হতাশা, যা প্রকাশ পাচ্ছে আত্ম-সমালোচনামূলক মিম বা রিলের মাধ্যমে। সেখানে জয়ের আশা করা একদল সমর্থকের ভাবনাকে "বোকামি" হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে।

ম্যাচের আগের দিন অর্থাৎ ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে বিরহের গানের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক পোস্টের ক্যাপশনে লেখা ছিল, "আমাদের হৃদয় ভাঙবে ১৪ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি দু'দিনেই।" তবে কট্টর কিংবা সাধারণ—সব ধরণের সমর্থকই নিয়ম করে তিন ঘণ্টারও বেশি সময়ের এই লড়াইটি দেখবেন। রবিবার সন্ধ্যা ৬:৩০ মিনিটে (১৩:৩০ জিএমটি) হাই-ভোল্টেজ এই ম্যাচটি দেখতে সারাদেশের মানুষ টিভির পর্দায় চোখ রাখবেন।

রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলোতে কাঠের বেঞ্চ, প্লাস্টিকের চেয়ার বা মাটিতে বসে ভিড় জমাবেন পুরুষ দর্শকরা। ম্যাচের দিন খাবারের অর্ডারের চাপে ব্যস্ত ফুড ডেলিভারি রাইডাররাও মাঝে মাঝে যাত্রা বিরতি দিয়ে ফোনে বা রেস্তোরাঁগুলোর জানলা দিয়ে একনজর খেলা দেখে নেবেন। অন্যদিকে, অভিজাত রেস্তোরাঁগুলো বড় পর্দার ব্যবস্থা করবে, যেখানে জড়ো হবে তরুণ ভক্ত এবং পরিবারগুলো।

খেলা শুরুর আগেই ঘরের কাজকর্ম সেরে নেওয়া হবে। ড্রয়িংরুমে টিভির সামনে পানীয়, স্ন্যাকস এবং বিরিয়ানির ভোজ নিয়ে জড়ো হবে যৌথ পরিবারগুলো। অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক কারণে এখন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ সাধারণত সপ্তাহান্তেই অনুষ্ঠিত হয়। স্কুল-অফিসের ব্যস্ত রুটিন আর করাচির অসহনীয় যানজট থেকে এই সপ্তাহান্তের ম্যাচটি নগরবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দেবে।

ভারত ফেভারিট, তবে জয়ের চাবিকাঠি হতে পারেন উসমান তারিক

এত জল্পনা-কল্পনা ও প্রস্তুতির পরও সমর্থকদের প্রত্যাশা বেশ বাস্তবসম্মত। শুক্রবার বিকেলে করাচিতে জুমার নামাজের বিরতির পর যখন জনজীবন স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, তখন একদল তরুণ আইন শিক্ষার্থী স্থানীয় লিগ ম্যাচের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন।

করাচি পার্সি ইনস্টিটিউটে খেলার ফাঁকে তালহা বানদায়াল নামের এক শিক্ষার্থী আল জাজিরাকে বলেন, "ভারতের পক্ষে জয়ের সম্ভাবনা ৭০-৩০।" তবে বানদায়াল ও তার বন্ধুরা করাচির এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় বসে খেলাটি দেখার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, "এটা পাকিস্তান-ভারত ম্যাচ। ফলাফল যাই হোক, আমরা রোমাঞ্চিত!"

ওই ম্যাচের থার্ড আম্পায়ার সৈয়দ আহমেদ শাহ অবশ্য দলের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তিনি অনেকটা পুরো দেশের হতাশাজনক মনোভাবেরই প্রতিধ্বনি করলেন। চশমা পরা শাহ বেশ নিরসভাবেই বললেন, "আমাদের দেশে খেলাধুলাও রাজনীতির মতোই।" জাতির সবচেয়ে প্রিয় দুটি বিষয়ের তুলনা টেনে তিনি বলেন, "ভারত আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, শুধু ক্রিকেটে নয়, সব দিক দিয়ে।"

সারা সপ্তাহজুড়ে জাতীয় টক শো-গুলোতে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা দলের ঘাটতি, ক্রিকেট বোর্ডের সাংগঠনিক ব্যর্থতা এবং এমন বড় ম্যাচের জন্য স্কোয়াডের মানসিক দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে বানদায়ালের মতো স্থানীয় ক্রিকেটাররা পাকিস্তানের শক্তিমত্তা নিয়েও ভাবছেন। উসমান তারিকের দুর্বোধ্য স্পিন অ্যাকশন এবং বৈচিত্র্যকে পাকিস্তানের গোপন অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যখন জীবন থমকে দাঁড়ায়

মাঠের বাইরের আচরণের ক্ষেত্রে, ভারতীয় দলের পাকিস্তানি দলের সঙ্গে করমর্দন এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ভালোভাবে নেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ক্রিকেট কোচ সূর্যকুমার যাদব ও তার দলের গত বছরের এশিয়া কাপের বিতর্কিত আচরণের সমালোচনা করে বলেন, "খেলাধুলা থেকে রাজনীতিকে কঠোরভাবে আলাদা রাখা উচিত।" ৪৬ বছর বয়সী ওই কোচ আরও বলেন, "কিন্তু ভারত যদি এমন অবস্থান নেয়, তবে পাকিস্তানেরও আত্মসম্মান বজায় রেখে সেভাবেই জবাব দেওয়া উচিত।"

স্বীকার করতেই হবে, যে লড়াই ঐতিহাসিকভাবে দুর্দান্ত বোলিং, বিধ্বংসী ইনিংস কিংবা শ্বাসরুদ্ধকর সমাপ্তির জন্য মনে রাখা হতো, সেখানে এখন করমর্দন বিতর্কই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই পাকিস্তানের ক্রিকেট ভক্তরা পাড়া-মহল্লার অলিগলি বা ধুলোমাখা মাঠে নিজেরা ক্রিকেট খেলায় মেতে উঠবেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে কলম্বোর সেই মহারণের প্রস্তুতির জন্য সব গুছিয়ে নেওয়া হবে।

ঠিক দুদিন আগে জুমার নামাজের জন্য যেভাবে জীবনের কোলাহল থেমে গিয়েছিল, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচও ঠিক সেটাই করবে। সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তানে কেবল ক্রিকেট এবং জুমার নামাজই পারে জনজীবনকে সম্পূর্ণভাবে থমকে দিতে।ৎ

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই