
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান ইউরোপের সঙ্গে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সেই উত্তেজনার ঢেউ এবার এসে লেগেছে বৈশ্বিক ক্রীড়াঙ্গনে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপ বর্জনের আহ্বান উঠেছে ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং ফুটবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কণ্ঠে।
যদিও এখন পর্যন্ত কোনো বড় রাষ্ট্র বা দায়িত্বশীল ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিকভাবে বয়কটের ঘোষণা দেয়নি, তবুও এই আলোচনা যে নিছক কল্পনা নয়, তা পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক রাজনীতি যখন ক্রমেই খেলাধুলার ময়দানে প্রভাব বিস্তার করছে, তখন বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনও সেই টানাপোড়েনের বাইরে থাকছে না।
জার্মানি থেকে শুরু, ইউরোপে প্রতিধ্বনি
বিশ্বকাপ বয়কটের প্রসঙ্গটি প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আনেন জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি ও হামবুর্গের আলোচিত ক্লাব এফসি সেন্ট পাউলির সভাপতি ওকে গ্যোটলিশ। জার্মান দৈনিক হামবুর্গার মর্গেনপোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “২০২৬ বিশ্বকাপ বর্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা ও আলোচনা করার সময় এসে গেছে।”
গ্যোটলিশ আশির দশকের অলিম্পিক বর্জনের উদাহরণ টেনে বলেন, “১৯৮০–এর দশকে অলিম্পিক গেমস বর্জনের পেছনে যেসব যুক্তি ছিল, সেগুলো কী ছিল? আমার হিসেবে, এখনকার সম্ভাব্য হুমকি তখনকার চেয়েও বড়।” তার এই মন্তব্য ইউরোপীয় ফুটবল মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান আগ্রাসনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বড় একটি অংশ ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বর্জন করেছিল। এর পাল্টা জবাবে ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক বর্জন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো।
ব্লাটার-পিয়েথের কণ্ঠে সমর্থন
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেন ফিফার বিতর্কিত সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটার। তিনি সুইজারল্যান্ডের সাবেক দুর্নীতিবিরোধী কৌঁসুলি মার্ক পিয়েথের বক্তব্য প্রকাশ্যে সমর্থন করেন। সুইস দৈনিক ডার বুন্ড-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিয়েথ বলেন, “আমরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, সবকিছু বিবেচনায় নিলে সমর্থকদের জন্য একটাই পরামর্শ—যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে থাকুন।”
পিয়েথ আরও সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের সময় সমর্থকদের মনে রাখতে হবে, কর্তৃপক্ষের মনঃপূত না হলে যে কাউকে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে ব্লাটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “মার্ক পিয়েথ এই বিশ্বকাপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় সঠিকই করেছেন।”
আফ্রিকা থেকেও বয়কটের সুর
ইউরোপের বাইরে আফ্রিকাতেও বয়কটের আহ্বান শোনা যাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান বিরোধী নেতা জুলিয়াস মালেমা দেশটির ফুটবল সংস্থা সাফা এবং জাতীয় দল বাফানা বাফানাকে ২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
মালেমা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে দক্ষিণ আফ্রিকার অতীত বর্ণবাদী শাসনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “যেভাবে তখন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রও এখন তেমন আচরণ করছে।” তার ভাষ্য, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদে যেমন একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপও বর্জন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, “আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পারি না, যখন একজন মানুষ গোটা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তোলে আর সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে।”
ইউরোপীয় ফেডারেশনগুলোর দোটানা
খবর অনুযায়ী, প্রায় ২০টি ইউরোপীয় ফুটবল ফেডারেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপ বর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য, ভেনেজুয়েলা ইস্যু, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অভিবাসন দমন অভিযানের মতো বিষয়গুলো তাদের উদ্বিগ্ন করছে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সেও কয়েকজন আইনপ্রণেতা ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তাদের মতে, বিশ্বকাপ বর্জনের মাধ্যমে ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রত করা যেতে পারে।
নেদারল্যান্ডসে এক লাখের বেশি সমর্থক ইতোমধ্যে একটি অনলাইন পিটিশনে স্বাক্ষর করেছেন, যাতে জাতীয় দলকে টুর্নামেন্ট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে ডাচ ফুটবল সংস্থা কেএনভিবি জানিয়েছে, আপাতত তারা কোনো ধরনের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। সংস্থাটির ভাষ্য, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
বয়কট হলে আসলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কে?
বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য বয়কটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আসলে শাস্তি পাবে কে? ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একজন রাজনীতিক, যিনি বিশ্বকাপ নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান না। বয়কটের হুমকিতে তার নীতিগত অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনাও কম। বরং তিনি বিষয়টি উপেক্ষা করেই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অভিজাত শ্রেণিরও এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা নেই। বিশ্বকাপ থেকে মূল আয়ের সিংহভাগই যায় ফিফার ঘরে। ফিফা কিছুটা ভাবমূর্তির ক্ষতির মুখে পড়লেও সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রির আয় তাদের পাওয়া হয়েই যাবে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা আসবে বয়কটকারী দল, খেলোয়াড় এবং সমর্থকদের ওপর। তারা নিজেদের দেশকে বিশ্বকাপে খেলতে বা দেখতে পারবে না। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সেই অসংখ্য মানুষ, যারা বিশ্বকাপ ঘিরে কাজ ও পর্যটন থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন।
ইতিহাস কী বলে?
ইতিহাস বলছে, বড় ক্রীড়া আসরের বয়কট খুব কম ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল বয়ে এনেছে। ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সালের অলিম্পিক বর্জনগুলোর কোনোটিই সরাসরি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং দুটি অলিম্পিকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর বহু অ্যাথলেট হারিয়েছেন আজীবনের সুযোগ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে বয়কট আরও বিরল। ১৯৩৪ সালে উরুগুয়ে ইতালিতে বিশ্বকাপে যায়নি, ১৯৩৮ সালে খেলেনি উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। ১৯৬৬ সালে আফ্রিকান দেশগুলো সীমিত সুযোগের প্রতিবাদে বর্জন করেছিল বিশ্বকাপ। এসব ঘটনাই দেখায়, বয়কট শেষ পর্যন্ত খেলাধুলাকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ বয়কটের আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। বাস্তবে এটি কার্যকর হবে কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্তের ওপর। যদি নতুন করে বড় কোনো বিতর্ক তৈরি হয়, তবে এই বয়কটের সুর আরও জোরালো হতে পারে। তবে ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছে, বয়কটের পথে হাঁটা যতটা আবেগী সিদ্ধান্ত, ততটাই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।



