
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে রাজপথে সক্রিয় ত্যাগী নেত্রী, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নির্যাতন ও গুমের শিকার পরিবারের সদস্যরা মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
এতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা এবং সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খানের নাম আলোচনার শীর্ষে রয়েছে।
এ ছাড়া, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও কয়েকজন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সহধর্মিণী হাসিনা আহমেদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সহধর্মিণী রুমানা মাহমুদ এবং হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সহধর্মিণী সাবিনা ইয়াসমিন ছবি। তারা সবাই নিজ নিজ স্বামীর অবর্তমানে সংশ্লিষ্ট আসনে বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন।
এদিকে, দলের কেন্দ্রীয় নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে শাম্মী আক্তার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, নিলোফার চৌধুরী মনি ও রেহেনা আক্তার রানুর নামও আলোচনায় রয়েছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভীন ও কনক চাঁপাও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রয়েছেন।
আইন ও পেশাজীবী অঙ্গন থেকেও একাধিক নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে সাংবাদিক প্রতিনিধি হিসেবে শাহনাজ পলি ও কাজী জেসিন, অ্যাডভোকেট সিমকী ইমাম খান, সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের কন্যা ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া, বিএনপির নেতাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায়ের কন্যা অপর্ণা রায়, ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহারীন খান, সাবেক এমপি প্রয়াত আমান উল্লাহ চৌধুরী ও একুশে পদকপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী প্রয়াত বেগম রাহিজা খানম ঝুনুর কন্যা নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, লন্ডন বিএনপির সাবেক সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমেদের কন্যা সাবরিনা খান, বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের কন্যা ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুনি ও পুত্রবধূ খাদিজাতুল কোবরা সুমাইয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি নামও আলোচনায় রয়েছে। তিনি রাজধানীর মিরপুরের সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান নিউটনের সহধমির্ণী ও ফ্যাসিবাদী আমলে বিডিআর হত্যা মামলায় জেলখানায় আটক থাকাকালে নিহত লালবাগের সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন।
আরও আলোচনায় রয়েছেন, ঢাকা জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী, ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক সেলিনা সুলতানা নিশিতা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, মহিলা দলের সহ-স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আর্লি, সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নী, বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরুদ্দিন পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আক্তার কল্পনা, সেলিমুজ্জামান সেলিমের স্ত্রী সাবরিনা শুভ্র, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক ভিপি অধ্যাপক নাজমা সুলতানা ঝংকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাজমেরি ইসলাম, অধ্যাপক তাহমিনা বেগম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নাহারিন খান, ডা. সৈয়দা তাজনিন ওয়াইরিস সিমকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল সংসদের সাবেক ভিপি সেলিনা হোসেন, ছাত্রদল নেত্রী মানসুরা আক্তার।
চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সভাপতি মনোয়ারা বেগম মনি ও সাধারণ সম্পাদক জেলী চৌধুরী, উত্তর জেলা মহিলা দলের সভাপতি মেহেরুন নেছা নার্গিস, দক্ষিণ জেলা মহিলা দলের সভাপতি জান্নাতুল নাঈম রিকু, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক কাউন্সিলর জেসমিনা খানম, চট্টগ্রাম মহানগরের মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদা আক্তার লিটা, চট্টগ্রাম নগর মহিলা দলের সহ-সভাপতি জেসমিনা খানম ও ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজ চেয়ারম্যানের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন, বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আকতার জাহান শিরিন, ঝালকাঠি জেলা বিএনপি নেত্রী জেবা আমিন খান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর কন্যা সামিরা তানজিনা চৌধুরী, সিলেটের সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেনের কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেন, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নাসিমা আক্তার কেয়া, খুলনা-বাগেরহাট অঞ্চলের সংরক্ষিত আসনে আলোচনায় আছেন ফারজানা রশিদ লাবনী ও খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্র সংসদে দুইবার নির্বাচিত ভিপি ফারজানা রশীদ লাবনী, গাজীপুর জেলা বিএনপি সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ রিয়াজুর হান্নানের স্ত্রী ফাতেমা বিনতে দোহা, ময়মনসিংহ জেলা মহিলা দলের সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেত্রী তানজিন চৌধুরী লিলি, পাবনার সাথিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক খায়রুন নাহার, আওয়ামী লীগের হামলায় নিহত নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল হক বাবুর সহধর্মিণী মহুয়া নূর কচি ও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবার নাম মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছে।
এ ছাড়া, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পরাজিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সাবিরা সুলতানা, সানজিদা ইসলাম তুলি, নাদিরা চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের নাম থাকতে পারে পারে বলেও গুঞ্জন চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির চেয়ারম্যান কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সমাজের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ‘পরিচিত’ থেকে কয়েকজনকে বাছাই করা হতে পারে। যদিও সম্ভ্যাব্য আলোচিত প্রার্থীদের নাম প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান তিনি।
তবে সম্প্রতি বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমকে বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করবে দলের স্থায়ী কমিটি। যোগ্য ও কার্যকর প্রার্থীদেরই মনোনয়ন দেবে দল। আমি দলের চেয়ারম্যানের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলতে পারি, তিনি সময়োপযোগী সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে যোগ্যদেরই বাছাই করবেন।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, বিএনপিতে অসংখ্য যোগ্য নেত্রী রয়েছেন। বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে তাদের অবদান বিবেচনা করেই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্ধারণ করবেন কারা সংরক্ষিত নারী আসনে যাবেন। তবে এবার তরুণ নেত্রীদের মূল্যায়নের সম্ভাবনা বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে। নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, সাধারণ আসনে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন বণ্টন করা হবে। সেই হিসেবে বিএনপি জোট পেতে যাচ্ছে ৩৬টি আসন, জামায়াত জোট ১৩টি এবং একজন স্বতন্ত্র সদস্য একটি আসন পাবেন।
এদিকে, নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ২১ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে, বাছাই হবে ২২ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল, প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল এবং ১২ মে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।



