
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ যখন ধ্বংসাত্মকভাবে আরও একটি দিন পার করছে, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিকরা নিজেদের দীর্ঘদিনের লালিত মতাদর্শকে বৈধতা দিতে এই অনিশ্চয়তার মাঝেও একটি পরিষ্কার আখ্যান দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। ইসরায়েল কথা বলছে "মধ্যপ্রাচ্য বদলে দেওয়া" নিয়ে, আর যুক্তরাষ্ট্রের মুখে "মার্কিন জনগণকে রক্ষার" বুলি। উভয়েই জপমালার মতো "সরকার পতন"-এর কথা জপছে, যদিও ইরানের প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাবনা এখনও অস্পষ্ট।
এখন পর্যন্ত, সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনাও ইরানের ভেতরে সেই গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার প্রত্যাশা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল করেছিল। অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা বারবার বলছেন যে, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনো সরকারের পতন ঘটানো যায় না।
তারপরও, যুদ্ধে হার-জিত থাকেই। তাহলে এই যুদ্ধে জিতছে কে? তাৎক্ষণিক ধারণায় মনে হতে পারে যে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রই হয়তো বিজয়ী হচ্ছে। সর্বোপরি, উভয় দেশই বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে এবং মনে হচ্ছে তারা আকাশ ও সমুদ্রপথে হামলা চালিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রায় ধ্বংস করে দিচ্ছে। নেতৃত্বকে এভাবে পুরোপুরি নির্মূল করার চেয়ে বড় অর্জন আর কীই বা হতে পারে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুর্বল প্রতিক্রিয়া এবং বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে এশিয়ার নীরবতা বিবেচনা করলে এই ধারণা আরও জোরালো হয় যে— ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জিতে গেছেন। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই সর্বাত্মক আগ্রাসনের বিপরীতে কোনো কার্যকর বিকল্প প্রস্তাব করার মতো সক্ষমতাও যেন কারও নেই।
তবে আমি বর্তমান পরিস্থিতির একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে চাই। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমার মনে হয় নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প হয়তো সংঘাতের প্রথম এবং তাৎক্ষণিক কৌশলগত ধাপে জয়ী হয়েছেন, যদিও এই "বিজয়"ও বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি স্বার্থের মিল হওয়ার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। তবে পুনরুজ্জীবিত এই জোটের আয়ুষ্কাল ঠিক ততটাই সংক্ষিপ্ত, যতটা সময় তাদের নিজ নিজ সাফল্যকে একান্ত নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে লাগবে।
তাদের স্বার্থের প্রথম মিলটি হলো রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। ইসরায়েলের ভেতরে নেতানিয়াহুকে অবশ্যই তার নিজের নেতৃত্বের ভাবমূর্তির সাথে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ধারাবাহিক ব্যর্থতার একটি দূরত্ব তৈরি করতে হবে। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের গণহত্যা যেমন চলছে, তেমনি তারা গাজার ওপর থেকেও নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছে। তুরস্ক ও কাতারের ভূমিকা ঠেকাতে তাদের চেষ্টাও এখন পর্যন্ত ব্যর্থ।
পশ্চিম তীরে, ইসরায়েলি রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনী জমি দখল এবং জাতিগত নিধনে সর্বাত্মক সহায়তা ও মদদ দিয়ে যাচ্ছে। যদিও বেশিরভাগ ইসরায়েলি এর কোনোটিরই বিরোধিতা করে না, তবে পুরোপুরি রাজনীতিকরণের শিকার হওয়া যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আইন সমুন্নত রাখার ভান করে, তাদের ওপর ইসরায়েলিদের আস্থা ক্রমাগত কমছে।
নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুকে অবশ্যই এই ব্যর্থতার দায় থেকে নিজেকে মুক্ত দেখাতে হবে। ইরানকে বেশিরভাগ ইসরায়েলি সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করে, তাই সেখানে একটি 'জয়' তাকে পুনরায় এমন একমাত্র নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে, যিনি ইসরায়েলকে রক্ষা করতে সক্ষম।
প্রধানমন্ত্রীর এই চাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও, যদিও গত এক বছর ধরে সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা বিরাজ করছে। নেতানিয়াহু যদি একটি জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে থাকেন, তবে সেনাবাহিনী আরও বেশি মরিয়া। ৭ অক্টোবর, ২০২৩-এর ঘটনার জন্য এককভাবে দায়ী হওয়া এড়াতে চায় তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, এবং এরই মধ্যে তারা বাজেটে বিশাল বরাদ্দের দাবি তুলেছে। কেবল একটি "ঐতিহাসিক বিজয়"ই সামরিক বাহিনীর এই দায়মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে, ট্রাম্প শুধু একটি বিজয়ের জন্যই নয়, বরং মানুষের মনোযোগ ঘোরানোর জন্যও মরিয়া হয়ে আছেন। ভেনিজুয়েলায় তার "বীরত্ব" মানুষ আগেই ভুলে গেছে, অন্যদিকে এপস্টাইন ফাইলে উল্লেখিত তার "কেলেঙ্কারিগুলো" দিন দিন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে।
তার মুখে "সরকার পতন"-এর মতো শব্দের ব্যবহার ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট মনে হচ্ছে, যা যে কোনো অর্থেই ব্যাখা করা যায়। এর ফলে যে কোনো সময় নিজের সুবিধামতো তিনি "মিশন সফল" বলে ঘোষণা দিতে পারবেন। ট্রাম্প নিজেকে এমন একজন হিসেবে জাহির করতেও আগ্রহী, যিনি বিশ্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম, আর সেই নীতির মূল কথা হলো— "জোর যার মুল্লুক তার"। নিজ সমর্থকদের কাছে তার দেওয়া "বিদেশে আর কোনো যুদ্ধ নয়" প্রতিশ্রুতির সাথে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এই চেষ্টার যে স্পষ্ট স্ববিরোধিতা রয়েছে, তা চিরস্থায়ী জুজু হিসেবে পরিচিত ইরানের ক্ষেত্রে খুব সহজেই ঢাকা পড়ে যায়।
এত কিছুর পরও সত্য হলো, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু পরস্পরকে মোটেও বিশ্বাস করেন না। তাৎক্ষণিক স্বার্থ আদায় ছাড়া এই সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার আর কোনো কারণ তাদের কারও কাছেই নেই। একবার মনোযোগ ঘোরানোর এই কৌশলটির কার্যকারিতা ফুরিয়ে গেলে, উভয়কেই একটি অনিশ্চিত যুদ্ধের মুখে পড়তে হবে। ট্রাম্প দ্রুত অভিযান শেষ করার চাপে পড়বেন, অন্যদিকে নেতানিয়াহু চাইবেন একে দীর্ঘায়িত করতে।
একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য এবং জনসমর্থন কোনোটিই ট্রাম্পের নেই। তিনি সরাসরি "মাটিতে সেনা নামাতে" পারবেন না, আর এ কারণেই ইরানিরা যখন তাদের দেশের নিয়ন্ত্রণ নেবে তখন তাদের "সাহায্য করা" বা "পাশে থাকার" বারবার বার্তা দিচ্ছেন তিনি। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই যুদ্ধ শুরু করা, মার্কিন সেনাদের সম্ভাব্য প্রাণহানি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির কারণে নিজ দেশেই তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
গাজার মতোই নেতানিয়াহুর কাছেও ধ্বংস ও মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাস্তব পরিকল্পনা নেই। বিরোধীদের দাবিয়ে রাখা এবং নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিশ্চিত করার জন্য তিনি যুদ্ধকে যতটা সম্ভব দীর্ঘায়িত করতে চান। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, যুদ্ধ সম্পর্কে সরকারি বার্তাগুলোতে বলা হচ্ছে, ইসরায়েল "যতদিন প্রয়োজন" ততদিন এই যুদ্ধে থাকবে এবং এটি "জুন মাসের যুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘ" ও একটি "ঐতিহাসিক অভিযান" হবে। এই ফাঁকা বুলি যত বাড়বে, এই অভিযান ততই পরিণত হবে এক অন্তহীন, নির্বিচার বোমা হামলা ও ক্রমবর্ধমান বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনায়।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যখন ক্রমশ ভিন্ন সুরের বিবৃতি দিতে শুরু করবে, যার যার নিজস্ব যৌক্তিকতা ও সময়সীমার কথা বলবে— তখন এই ব্যবধানটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র (ইরান) যখন নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করবে (যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রটি দিব্যি টিকে আছে), ট্রাম্প তখন পরোক্ষভাবে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে ইসরায়েল "প্রকৃত সরকার পতন"-এর মতো চমকপ্রদ ও সীমাহীন শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে তাদের অগ্রগতির কথা ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রাখবে। খেয়াল রাখবেন, এই অশুভ জোটটি ধীরে ধীরে গড়ে উঠলেও খুব শিগগিরই তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। দিনশেষে তাদের এই জয় বড়জোর একটি 'পিরিক বিজয়' (এমন এক জয়, যার খেসারত পরাজয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়) হয়েই থাকবে।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই



