ডোনাল্ড ট্রাম্প, বোর্ড অব পিস
ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দীর্ঘদিনের মিত্রদের অপমান করতে ছাড়েননি ট্রাম্পছবি: সংগৃহীত

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে আমেরিকা’ নীতিতে মিত্রদেশগুলো যেন গৌণ, আর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টরা ছিলেন বোকা। সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল বা শুল্ক যুদ্ধের হুমকি থেকে কিছুটা সরে আসলেও, ইতিহাসের নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দীর্ঘদিনের মিত্রদের অপমান করতে ছাড়েননি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেএককবিজয়!
দাভোসে বিশ্বনেতাদের সামনে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি নয়, বরং আমেরিকা একাই জয়ী হয়েছিল। ইউরোপীয় দর্শকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আমরা বিরাট জয় পেয়েছি। আমরা না থাকলে আপনারা এখন জার্মান ভাষায় এবং সম্ভবত কিছুটা জাপানি ভাষায় কথা বলতেন।”

ট্রাম্পের এই দাবি ইতিহাসের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ৮০ বছর আগের সেই যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছিল (কয়েক মিলিয়ন), এরপর ছিল চীন। গ্রেট ব্রিটেনও তাদের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ হারিয়েছিল। আমেরিকাও প্রচুর সৈন্য হারিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে, এটি ছিল আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্যের সম্মিলিত ‘মিত্রশক্তি’র (বিগ থ্রি) বিজয়।

গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ক প্রসঙ্গ :
ট্রাম্প দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডেনমার্ককে রক্ষা করতে আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি গড়তে ‘বাধ্য’ হয়েছিল। তিনি বলেন, “ডেনমার্ক জানে যে আমরা আক্ষরিক অর্থেই তাদের জন্য ঘাঁটি তৈরি করেছিলাম। আমরা অন্য কারও জন্য যুদ্ধ করিনি।”

তবে ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানির কাছে ডেনমার্ক আত্মসমর্পণ করার পর, ১৯৪১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট নিজ দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি করার চুক্তি করেছিলেন। রুজভেল্ট তখন স্পষ্ট করেছিলেন যে, নাৎসিরা গ্রিনল্যান্ড দখল করলে তা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

ট্রাম্প আরও মন্তব্য করেন, যুদ্ধের পর গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্ককে ফিরিয়ে দেওয়া আমেরিকার বোকামি ছিল। তিনি বলেন, “আমরা কতটা বোকা ছিলাম যে ওটা ফেরত দিয়েছিলাম?” অথচ বাস্তবে আমেরিকা কখনোই গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা নেয়নি, তাই ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

ন্যাটো এবং মিত্রদের প্রতি অবিশ্বাস :
ট্রাম্প ন্যাটো জোটের মিত্রদের বিশ্বস্ততা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। কিন্তু ট্রাম্প বলেন, “আমি নিশ্চিত নই যে আমাদের ওপর আক্রমণ হলে তারা (মিত্ররা) এগিয়ে আসবে কিনা। আমরা তাদের জন্য থাকব, কিন্তু তারা আমাদের জন্য থাকবে কিনা—তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।”

ট্রাম্পের এই দাবিও তথ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ইতিহাসের একমাত্র বার যখন ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’ কার্যকর করা হয়েছিল, তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই—৯/১১ হামলার পর। তখন ডেনমার্কসহ ন্যাটো মিত্ররা আমেরিকার ডাকে সাড়া দিয়ে আফগানিস্তানে যুদ্ধ করেছিল। সেই যুদ্ধে ডেনমার্কের ৪৩ জন সৈন্য নিহত হন, যা দেশটির জনসংখ্যা বিবেচনায় একটি বড় ত্যাগ।

কানাডার সতর্কতা :
দাভোসে কানাডার প্রতিনিধি মার্ক কার্নি সতর্ক করে বলেছেন, আমেরিকার নেতৃত্বে যে বিশ্বব্যবস্থা এতদিন টিকে ছিল, তা এখন অতীতের বিষয়। তিনি অন্যান্য দেশকে একত্রিত হয়ে নতুন ধরনের বহুপাক্ষিকতা অনুসরণ করার আহ্বান জানান। তার মতে, এই সত্যটি স্বীকার না করা মানে “মিথ্যার মধ্যে বসবাস করা।” ট্রাম্পের এই একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চা এবং মিত্রদের প্রতি অবজ্ঞা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার অবস্থান ও দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

 

সূত্র : সিএনএন

আরটিএনএন/এআই