
বর্তমানে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা আলোচনা চলছে। নাগরিক অধিকার বা স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে যে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়ানো হচ্ছে, তার পেছনের কারিগর কারা—সেটি এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশগুলোকে ধ্বংস করার জন্য 'গণতন্ত্র' বা 'মানবাধিকার' শব্দগুলোকে বারবার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ ইরানের ক্ষেত্রেও কি সেই একই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে?
ইতিহাসের নিষ্ঠুর শিক্ষা: লিবিয়া ও ইরাকের পতন
আজ যারা ইরানের সরকার পতনের স্বপ্ন দেখছেন, তাদের জন্য মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং সাদ্দাম হোসেনের উদাহরণ সবচেয়ে বড় সতর্কতা হওয়া উচিত।
১) ইরাক ও সাদ্দাম হোসেন: ২০০৩ সালে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ এবং ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ খোঁজার নাম করে ইরাকে আক্রমণ চালায় আমেরিকা ও তার মিত্ররা। ফলাফল কী হলো? সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর ইরাক এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, আইএসআইএস-এর উত্থান এবং দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ দেশটিকে কয়েক দশক পিছিয়ে দিয়েছে।
২) লিবিয়া ও গাদ্দাফি: লিবিয়া ছিল আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। সেখানেও ‘স্বৈরাচারী’ তকমা দিয়ে গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মদদ দেয় পশ্চিমা শক্তি। আজ লিবিয়া একটি খণ্ড-বিখণ্ড রাষ্ট্র, যেখানে নেই কোনো স্থিতিশীল সরকার, আছে কেবল বিশৃঙ্খলা আর তেলের দখল নিয়ে লড়াই।
ইরানের ওপর দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মূলত দেশটির সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তোলার একটি কৌশল। যখন অর্থনৈতিক চাপে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, তখন সেই ক্ষোভকে পুঁজি করে পশ্চিমা মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো রাস্তায় নামে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ইরানের মানবাধিকার রক্ষা করা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একমাত্র শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে দুর্বল করা। তারা চায় ইরানও যেন ইরাক বা লিবিয়ার মতো একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যাতে ওই অঞ্চলে পশ্চিমাদের একাধিপত্য বজায় থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো যেভাবে সুপরিকল্পিতভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ ইস্যুকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করছে, তা স্পষ্টতই একটি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের চক্রান্তের অংশ।
কেন সচেতন হওয়া জরুরি?
একটি দেশের সরকারের সাথে জনগণের দ্বিমত থাকতে পারে, সংস্কারের দাবি থাকতে পারে। কিন্তু সেই অসন্তোষ যখন বিদেশি শক্তির ইন্ধনে ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়, তখন তার পরিণতি কখনোই শুভ হয় না।
সাদ্দাম বা গাদ্দাফির পতন দেশবাসীকে শান্তি দিতে পারেনি, বরং তাদের দেশগুলোকে বিদেশি শক্তির চারণভূমিতে পরিণত করেছে। ইরানের সচেতন নাগরিকদের মনে রাখা উচিত, ঘরোয়া সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে। বিদেশি ‘ত্রাতা’ সেজে যারা এগিয়ে আসছে, তাদের আসল উদ্দেশ্য গণতন্ত্র নয়, বরং ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা বা পঙ্গু করে দেওয়া।
লেখক: সাহিত্যিক



