চারুকলায় বৈশাখের প্রস্তুতিতে রঙে রঙে ঐক্যের বার্তা
চারুকলায় বৈশাখের প্রস্তুতিতে রঙে রঙে ঐক্যের বার্তা।ছবি: আরটিএনএন

বৈশাখের প্রথম সকালকে বর্ণিল রূপ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদে দিনরাত এক করে কাজ করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বর্ষবরণ উপলক্ষে এবারের আয়োজনের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য।

শনিবার (১১ এপ্রিল) চারুকলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, শোভাযাত্রার জন্য বিশালাকৃতির মোটিফগুলোর কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। বাঁশ আর কাঠের সাহায্যে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে একেকটি প্রতীকী অবয়ব।

জয়নুল গ্যালারির সামনে প্রতিবছরের মতো চলছে মাটির সরায় আলপনা আঁকা, জলরঙে গ্রামবাংলার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা, বাঘ, প্যাঁচাসহ নানা কল্পিত চরিত্রের মুখোশ তৈরির কাজ। এছাড়া অনুষদের বাইরের দেয়ালগুলোতেও রং-তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠছে দেশজ সংস্কৃতির নানা চিত্র। নিজেদের তৈরি এসব শিল্পকর্ম দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রি করে শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহ করছেন শিক্ষার্থীরা।

এবারের শোভাযাত্রায় লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে পাঁচটি প্রধান মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো হলো— লাল ঝুঁটির মোরগ, দোতারা, সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি, শান্তির প্রতীক পায়রা এবং কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টেপা ঘোড়া।

চারুকলার ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফারিন জানান, বৈশাখ মানেই চারুকলায় এক রঙিন উৎসব, যেখানে মিলে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। এই সময়ে সাবেক অ্যালামনাই ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয় এক অনন্য সেতুবন্ধন। অনেকের জন্য এটি শুধু উৎসব নয়, বরং নতুন করে পরিচিত হওয়া, সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং স্মৃতি রোমন্থনের এক বিশেষ সুযোগ।

ফারিন আরও বলেন, বৈশাখের এই আয়োজন তাদেরকে শিক্ষকদের সঙ্গে একত্রে কাজ করার বিরল সুযোগ করে দেয়, যা বছরের অন্য সময়ে খুব একটা পাওয়া যায় না।

যারা পড়াশোনা শেষ করে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন, তাদের জন্যও বৈশাখ যেন এক টান। পরিবার, অফিস আর নানান ব্যস্ততার মাঝেও তারা সময় বের করে ফিরে আসেন প্রিয় চারুকলায়।

আরেক শিক্ষার্থী সিনথিয়া জানান, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পুরো প্রাঙ্গণ যেন রূপ নিয়েছে এক মিলনমেলায়। আয়োজকদের ভাষ্য, চারুকলা থেকে পড়াশোনা শেষ হলেও এই জায়গার টান কেউই পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারে না। বৈশাখ এলেই সবাই যেন আবার ফিরে আসে নিজের পুরোনো ঠিকানায়।

চারতলায় চলছে মূল প্রস্তুতির কাজ। পাখির ঘরে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের পাখি—ছোট-বড়, লম্বা লেজের পাখির পাশাপাশি এবার নতুন সংযোজন হিসেবে থাকছে ধনেশ পাখি। একইসঙ্গে স্ট্রাকচার তৈরির কাজও এগিয়ে চলছে জোরেশোরে। তৈরি হচ্ছে একতারা, টেপা পুতুলের আদলে ঘোড়া, কাঠের পুতুলের আদলে খাঁটি এবং মোড় গাছের বিভিন্ন উপকরণ।

পটুয়া নাজির হোসেন জানান, তিনি তার মায়ের কাছ থেকেই পটচিত্র আঁকা শিখেছেন। তার শিল্পে মায়ের প্রভাব স্পষ্ট, যেখানে তিনি খুঁজে পান নিজের শিকড় ও বাংলাদেশকে।

তার আঁকা পাঁচটি পটচিত্রে উঠে এসেছে ‘গাজী-চম্পাবতী’, ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’, ‘বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর’সহ লোককথার ঐতিহ্যবাহী গল্প। পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ পট’-এ তুলে ধরা হয়েছে ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) এবং সাম্প্রতিক সময়ের সংগ্রামে তরুণ প্রজন্মের আত্মত্যাগের ইতিহাস।

এই বৈশাখ তাই শুধু উৎসব নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত উপস্থাপন।
পায়রা এবং কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টেপা ঘোড়া।

এদিকে গত ৩১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এবারের নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। 

বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ জানান, আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত যেসব উপাদান রয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও বর্তমান সময়ে তা সংরক্ষণ করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। 

তিনি বলেন, এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বর্তমান সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বার্তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ভোরের আলোয় মোরগের ডাক যেমন নতুন দিনের জানান দেয়, তেমনি এবারের পহেলা বৈশাখে তৈরি করা মোটিফ নতুন জাগরণের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চারুকলার শিক্ষার্থী দিদারুল ইসলাম বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ। এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রের শক্ত বার্তা দিতে চাই।

বর্ষবরণের কর্মযজ্ঞ দেখতে সাধারণ মানুষও চারুকলায় ভিড় করেছেন। মেয়েকে নিয়ে চারুকলায় আসা ঐশী বলেন, বাঙালির ঐতিহ্য কেমন তার ধারণা দিতেই মেয়েকে চারুকলায় নিয়ে এসেছি। এখানে এসে দেখছি এমন নির্ভেজাল ও নির্মল আনন্দ সচরাচর অন্য কোথাও মেলে না।