
সারাদেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। গত ১৫ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র ২৮ দিনে হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে ১৬৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে আরও ২টি শিশু। এ ছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগ এখন সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৭ হাজার ৪৭৮ জন। সংক্রমণের এই উচ্চহার জনঘনত্ব এবং সচেতনতার অভাবকেই নির্দেশ করে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাজশাহী বিভাগেও ৩ হাজার ৪৪৯ জন আক্রান্ত হয়েছে। ১৬৯ জন মৃতের মধ্যে মাত্র ২৪ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া গেলেও, বাকি ১৪৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের লক্ষণ নিয়ে। এই বিপুল সংখ্যক সন্দেহজনক মৃত্যু ইঙ্গিত দেয় যে, প্রকৃত ভয়াবহতা হয়তো আরও গভীর।
হামের লক্ষণগুলো
সাধারণত হামের লক্ষণগুলো ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পেতে শুরু করে। এটি কেবল সাধারণ জ্বর বা র্যাশ নয়, বরং এর লক্ষণগুলো ধাপে ধাপে প্রকট হয়। নিচে হামের প্রধান লক্ষণগুলো দেওয়া হলো-
প্রাথমিক লক্ষণসমূহ (প্রথম ৩-৫ দিন)
তীব্র জ্বর: হঠাৎ অনেক বেশি জ্বর আসা।
কাশি: শুকনো কাশি হওয়া।
সর্দি: নাক দিয়ে ক্রমাগত জল পড়া।
চোখ লাল হওয়া: চোখ ফুলে যাওয়া বা লাল হয়ে যাওয়া (কনজাংটিভাইটিস) এবং আলোতে অস্বস্তি বোধ করা।
কোপলিক স্পটস: এটি হামের একটি বিশেষ লক্ষণ। গালের ভেতরের দিকে বা মাড়ির পাশে ছোট ছোট সাদাটে বা নুনের দানার মতো দাগ দেখা দেয়।
পরবর্তী লক্ষণ (র্যাশ বা দানা ওঠা)
প্রাথমিক লক্ষণগুলো শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৫ দিন পর শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দেয়। এই দানাগুলো সাধারণত প্রথমে কানে পেছনে বা মুখমণ্ডলে শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে ঘাড়, বুক ও পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। র্যাশ ওঠার সময় শরীরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা ও ক্লান্তি, ক্ষুধা মন্দা বা কিছু খেতে না চাওয়া এবং অনেকের ক্ষেত্রে পাতলা পায়খানা বা বমি হতে পারে।
হামের কারণে শিশুদের নিউমোনিয়া, কানে ইনফেকশন বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা হতে পারে। তাই যদি দেখেন শিশুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, শরীর অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়ছে বা শিশু অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, তবে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।
হাম থেকে বাঁচার উপায় ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। সঠিক পদক্ষেপ ও সচেতনতাই পারে শিশুদের এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা করতে।
১. নিয়মিত টিকাদান: হাম প্রতিরোধের একমাত্র শক্তিশালী হাতিয়ার হলো এমআর টিকা। শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে দ্বিতীয় ডোজ অবশ্যই নিশ্চিত করুন। যদি কোনো কারণে টিকা বাদ পড়ে যায়, তবে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করে দ্রুত তা দিয়ে দিন।
২. আক্রান্ত শিশুর পরিচর্যা ও আইসোলেশন: যদি কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়, তাকে দ্রুত অন্য শিশুদের থেকে আলাদা করে ফেলুন। আক্রান্ত শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার যেমন পানি, স্যুপ, ডাবের পানি খাওয়ান।
৩. পুষ্টি ও ভিটামিন-এ ক্যাপসুল: হাম হলে শিশুর শরীরে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি দেখা দেয়, যা অন্ধত্ব বা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ান। পুষ্টিকর খাবার শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৪. লক্ষণ দেখা দিলে করণীয়: আতঙ্কিত না হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। জ্বরের সাথে কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে দানা দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিন। শিশুর ব্যবহৃত কাপড় ও বিছানা আলাদা রাখুন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। লক্ষণ দেখা দেওয়ার অন্তত ৫-৭ দিন শিশুকে বাইরে পাঠানো থেকে বিরত থাকুন যাতে অন্য কেউ সংক্রমিত না হয়।



