
নারী প্রধান পরিবারগুলোর আর্থিক সুরক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার নতুন একটি সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ চালু করতে যাচ্ছে। আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে (কড়াইল বস্তি সংলগ্ন) আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের নারী প্রধান পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (৯ মার্চ) সচিবালয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে পাইলটিং পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রতিটি এলাকায় প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করতে বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সদস্য সংখ্যা, শিক্ষা, বাসস্থান, পরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র এবং গৃহস্থালী সামগ্রী যেমন টেলিভিশন, ফ্রিজ, কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেন। একই সঙ্গে পরিবারের রেমিট্যান্স প্রবাহের তথ্যও নেওয়া হয়। পরে এসব তথ্য ইউনিয়ন কমিটি যাচাই-বাছাই করে এবং উপজেলা কমিটি চূড়ান্তভাবে তালিকা প্রস্তুত করে।
পাইলটিং পর্যায়ে সারা দেশে মোট ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারী প্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট বা দারিদ্র্য সূচক নির্ণয় করে পরিবারগুলোকে হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত—এই পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত হিসেবে চিহ্নিত ৫১ হাজার ৮০৫টি পরিবারের তথ্য পরীক্ষা করা হলে ৪৭ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ডাবল ডিপিং (একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা গ্রহণ), সরকারি চাকরি, পেনশনসহ বিভিন্ন কারণে কিছু পরিবার বাদ দিয়ে চূড়ান্তভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারী প্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদানের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
সরকার বলছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট পদ্ধতিতে সম্পন্ন হওয়ায় উপকারভোগী নির্বাচনে কোনো ধরনের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি নারী প্রধান পরিবারকে একটি করে আধুনিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়া হবে। স্পর্শবিহীন (কনট্যাক্টলেস) চিপ সম্বলিত এই কার্ডে কিউআর কোড এবং এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে কার্ডটি নিরাপদ, দীর্ঘস্থায়ী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে। একটি কার্ডের মাধ্যমে সাধারণত একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্যের তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য সংখ্যা পাঁচজনের বেশি হলে আনুপাতিক হারে একাধিক কার্ড দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান যদি অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পেয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে সেই সুবিধাগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রে পূর্বের ভাতা বা সহায়তা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
এই কর্মসূচির আওতায় পাইলটিং পর্যায়ে নির্বাচিত পরিবারগুলোকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে ভাতা দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে নগদ সহায়তার পাশাপাশি সমমূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া পাইলটিং পর্যায়ে কিছু নির্দিষ্ট শর্তও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পরিবারের সদস্য যদি সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বেতন-ভাতা বা পেনশন পেয়ে থাকেন, অথবা নারী পরিবারপ্রধান যদি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মচারী হিসেবে কর্মরত থাকেন, তাহলে সেই পরিবার এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবে না। একইভাবে কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিলাসবহুল সম্পদ যেমন গাড়ি বা এয়ার কন্ডিশনার থাকলে কিংবা পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র থাকলে সেই পরিবারও ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে না।
সরকার জানিয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ থেকেই এই কর্মসূচির ব্যয় নির্বাহ করা হবে। ভাতা প্রদান করা হবে জি-টু-পি পদ্ধতিতে, অর্থাৎ সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে। তথ্য সংগ্রহের সময়ই উপকারভোগীদের মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে কোনো ধরনের বিলম্ব, ভুল অ্যাকাউন্টে টাকা জমা বা মধ্যস্থতাকারীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই সুবিধাভোগীরা ঘরে বসেই সরাসরি সরকারের কাছ থেকে ভাতা পেতে পারবেন।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং বাস্তবায়নের জন্য আগামী জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা প্রায় ৬৬ দশমিক ০৬ শতাংশ সরাসরি নগদ সহায়তা হিসেবে সুবিধাভোগীদের দেওয়া হবে। বাকি ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা বা প্রায় ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ তথ্য সংগ্রহ, অনলাইন সিস্টেম উন্নয়ন, কার্ড প্রস্তুতসহ কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হবে।
সরকার আশা করছে, পরীক্ষামূলক এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে এবং নারী প্রধান পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



