
ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও দেশে বাস্তবে তেলের ঘাটতি না থাকার দাবি সরকারের। তবে মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র—রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, সীমিত বিক্রি এবং ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাজধানীর রামপুরা হাজিরপাড়া, রমনা ও শাহবাগ এলাকার একাধিক পেট্রোল পাম্প ঘুরে দেখা যায়, মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সামান্য জ্বালানি সংগ্রহের জন্য।
রামপুরা হাজিরপাড়া ফিলিং স্টেশনের এক কর্মকর্তা জানান, আগে প্রতিদিন দুই দফায় তেল সরবরাহ করা হলেও এখন তা কমে একবারে নেমে এসেছে।
তিনি বলেন, “আমরা বিকেল চারটা থেকে তেল দেওয়া শুরু করি। কখনো রাত আটটা, আবার কখনো রাত দুইটার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যায়। গতকাল প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেল বিক্রি হয়েছে, আজ আসবে প্রায় ৯ হাজার লিটার।”
এদিকে তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন গুঞ্জনে আগেভাগেই তেল নিতে ভিড় বাড়ছে বলে জানান শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারের রাইডশেয়ার চালক নাবিল।
তার ভাষ্য, “আগামীকাল থেকে তেলের দাম বাড়বে—এই খবর শুনে আজ ভিড় বেশি। কিন্তু পাম্পে ৫০০-৬০০ টাকার বেশি তেল দেয় না, এতে আমাদের কাজ কমে যাচ্ছে।”
একই পাম্পে আরেক চালক জামাল বলেন, “ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আয় কমে যাচ্ছে।”
রমনা এলাকার পাম্পগুলোতেও একই চিত্র। অনেক পাম্পে নির্দিষ্ট সীমার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। ফলে কর্মব্যস্ত মানুষের সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি কমছে আয়।
একজন বাইকার রাজিব অভিযোগ করেন, “সব পাম্প যদি একসাথে তেল দিত, তাহলে এত ভোগান্তি হতো না। পাম্প মালিকদের একটি সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।”
তবে কিছু স্থানে শৃঙ্খলা বজায় রেখে তেল বিতরণ করতে দেখা গেলেও কোথাও কোথাও লাইনে বিশৃঙ্খলা ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে।
রমনা পেট্রোল পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা এবং শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তেল বিক্রি করা হবে। পাশাপাশি হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে তেল না দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) গ্রাহকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি না কেনার অনুরোধ জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সাশ্রয়ী ব্যবহার জরুরি।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদেও উত্তপ্ত আলোচনা হয়েছে। কুড়িগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু আমি নিজে পাম্পে ঘুরেও তেল পাইনি। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কতটা, তা সহজেই বোঝা যায়।”
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সংকট নেই বলে বক্তব্য দিলে বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়েন। পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
সরকারের দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই ফারাকই এখন বড় প্রশ্ন—তাহলে কি সত্যিই তেলের সংকট, নাকি এটি কৃত্রিম সংকট?



