মহাকাশ থেকে ফেরার পর শরীরে কী ঘটে? জানাচ্ছে গবেষণা
মহাকাশ থেকে ফেরার পর শরীরে কী ঘটে? জানাচ্ছে গবেষণাছবি: সংগৃহীত

মহাকাশ ভ্রমণ এখন আর কেবল বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের বিষয় নয়; বরং এটি মানবদেহের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে যা ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মহাকাশে অবস্থানের সময় এবং পৃথিবীতে ফেরার পরও নভোচারীদের শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী হতে পারে।

নাসারর হিউম্যান রিসার্চ প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোগ্রাভিটির কারণে মানবদেহের হাড় ও পেশীতে দ্রুত ক্ষয় শুরু হয়। পৃথিবীর মতো মাধ্যাকর্ষণজনিত চাপ না থাকায় হাড়ের ঘনত্ব প্রতি মাসে প্রায় ১ থেকে ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে পেশী দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণে নভোচারীদের মহাকাশে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে ব্যায়াম করতে হয়, তবুও পুরো ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হয় না।

মহাকাশে শরীরের তরল বণ্টনেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি জানিয়েছে, মাইক্রোগ্রাভিটির কারণে রক্ত ও অন্যান্য তরল শরীরের নিচের অংশ থেকে উপরের দিকে সরে যায় এবং মাথায় জমা হয়। এর ফলে চোখে চাপ সৃষ্টি হয় এবং দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় এ অবস্থাকে ‘স্পেসফ্লাইট অ্যাসোসিয়েটেড নিউরো-অকুলার সিনড্রোম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি করতে পারে।

মহাকাশ থেকে ফিরে আসার পর অনেক নভোচারীই ভারসাম্যহীনতা, বমিভাব এবং হাঁটাচলায় অসুবিধার মতো সমস্যায় ভোগেন। কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো বা হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়ে। গবেষণা বলছে, মহাকাশে দীর্ঘদিন থাকার ফলে শরীরের হরমোন, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং তরল বণ্টনে পরিবর্তন ঘটে, যা পৃথিবীতে ফিরে এসে নতুন করে মানিয়ে নিতে সময় নেয়।

নভোচারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই পরিবর্তনগুলোকে স্পষ্ট করে। অনেকেই জানিয়েছেন, মহাকাশ থেকে ফিরে পৃথিবীকে তাদের কাছে হঠাৎ ভারী, কোলাহলপূর্ণ এবং অদ্ভুতভাবে স্থির মনে হয়। এর কারণ হলো, শরীর ও মস্তিষ্ককে আবার নতুন করে মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। ফলে প্রথম কয়েক দিন মাথা ঘোরা, ভারসাম্য হারানোসহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

সাম্প্রতিক গবেষণায় মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ভারসাম্য ও চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলোতে সামান্য গঠনগত পরিবর্তন দেখা যায়, যা কখনো কখনো পৃথিবীতে ফেরার পর কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এজন্য অনেক নভোচারীর স্বাভাবিক চলাফেরায় ফিরে আসতে সময় লাগে।

এ ছাড়া মহাজাগতিক বিকিরণও বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সুরক্ষা না থাকায় মহাকাশে উচ্চমাত্রার বিকিরণের মুখোমুখি হতে হয়, যা ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তনের অনেকটাই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে, তবে সব ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ফিরে আসে না। বিশেষ করে হাড়ের ক্ষয় বা কিছু স্নায়বিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহের মতো দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে নভোচারীদের সুস্থ রাখতে কীভাবে এসব ঝুঁকি কমানো যায়, সেটিই এখন মহাকাশ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

সবমিলিয়ে বলা যায়, মহাকাশ ভ্রমণ মানবদেহের জন্য এক ধরনের কঠিন পরীক্ষা। এটি যেমন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করছে, তেমনি মানবদেহের সীমাবদ্ধতা ও অভিযোজন ক্ষমতা সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিচ্ছে। ভবিষ্যতের নিরাপদ মহাকাশযাত্রা নিশ্চিত করতে এসব শারীরিক পরিবর্তন গভীরভাবে বোঝা এবং কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।