
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক হামলার চার সপ্তাহ পরেও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। তবে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা এবং নিশ্চিত করা যে তেহরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাবে না।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলার লক্ষ্যও একই ছিল। এর এক মাস আগে, জাতিসংঘের পারমাণু শক্তি সংস্থা ‘আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা’ (আইএইএ) জানিয়েছিল, ইরানের কাছে ৪০৮ দশমিক ৬ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা আরও পরিশোধনের মাধ্যমে ৯টি পারমাণবিক ওয়ারহেড বা ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
আইএইএ আরও জানিয়েছে, তেহরানের কাছে প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ মাত্রার ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল রয়েছে, যা সহজেই সমরাস্ত্র-মানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ অমূলক ছিল না। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাছে প্রায় ২,৫০০ ব্যালিস্টিক মিসাইল রয়েছে, যা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বড়। এছাড়া তারা ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সমর্থনও ভোগ করছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলার কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “এটি অত্যন্ত সহজ। তাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখা সম্ভব নয়।”
ইরানের প্রতিরোধ ও পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনা ও বিজ্ঞানীদের ওপর হামলা স্বল্পমেয়াদে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধীর করতে পারে। তবে ইরান যদি যুদ্ধের মধ্যে টিকে থাকে, তবে তাদের শাসনব্যবস্থা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে আরও বেশি সংকল্পবদ্ধ হবে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফোর্ড স্কুলের ‘সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন অ্যান্ড ডিজআর্মামেন্ট’-এর পরিচালক রমেশ ঠাকুর টাইম ম্যাগাজিনকে বলেছেন, ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রই এখন একমাত্র বিষয় যা তাদের শাসনব্যবস্থার টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেবে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ’-এর সামরিক বিশ্লেষক জেনিফার কাভানাঘ বলেছেন, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের ব্যালেস্টিক মিসাইল অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, একটি পারমাণবিক বোমা এখন ‘প্রতিরোধ পুনর্গঠনের দ্রুততম পথ’ হতে পারে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও পারমাণবিক বিস্তার
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বিশ্বমঞ্চেও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটি এমন এক ‘পারমাণবিক দানবকে’ উন্মুক্ত করতে পারে, যা পুনরায় সীমাবদ্ধ করা কঠিন হবে। উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনও ইরান যুদ্ধকে উল্লেখ করে বলেছিলেন, তাদের দেশ পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে রাষ্ট্র-সমর্থিত সন্ত্রাস ও আগ্রাসনের দায়ী করেছেন।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি, সাদ্দাম হোসেন এবং ইউক্রেনের উদাহরণ স্পষ্টভাবে দেখায় যে পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করা যে কোনো দেশে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের জেসিপিওএ থেকে সরে আসার পর ইরানের ওপর প্রতিশ্রুতির স্থায়িত্বের প্রশ্নও বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
রমেশ ঠাকুর বলেন, ইরান যদি বর্তমান আক্রমণ থেকে টিকে যায়, তবে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা আরও বাড়বে। এটি সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশরসহ অন্যান্য দেশকেও নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্ররোচিত করবে।
নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অন্যান্য দেশকেও তাদের নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরক্ষা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। ইউরোপের মধ্যে রাশিয়ার নীতি পরিবর্তন ও ন্যাটোর সমালোচনা, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার পারমাণবিক দেশগুলো- ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়াসহ দক্ষিণ কোরিয়ায় জনমতের উত্থান, সবই এই সংকটকে আরও জটিল করেছে।
সিউলের ট্রয় ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড্যানিয়েল পিঙ্কস্টন বলেছেন, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছেন, “আপনাদের বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারব, তাই পারমাণবিক অস্ত্রের দরকার নেই।” কিন্তু বর্তমান প্রশাসন নিরাপত্তা সহযোগিতায় আগ্রহী নয়। এই উদ্বেগ বিশ্বে আরও পারমাণবিক বিস্তার ঘটাতে পারে এবং তা বিপর্যয়কর ভুল হিসাব ও পদক্ষেপের ঝুঁকি বাড়াবে।



