
দখলদার ইসরায়েলের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় ছয় দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ঈদুল ফিতরের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে করে জেরুজালেমজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানও আল–জাজিরা-এর খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকালে মুসল্লিরা মসজিদের দিকে এগোতে চাইলে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
১৯৬৭ সালের পর প্রথম ঘটনা
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর এই প্রথম ঈদের দিন আল-আকসা মসজিদ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হলো। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পুরো মসজিদ চত্বর কার্যত সিলগালা করে দেয়, ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাধ্য হয়ে আশপাশের সড়ক ও ফুটপাতে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করেন। জেরুজালেমের ওল্ড সিটির প্রবেশপথগুলোতেও কড়া নিরাপত্তা ও ব্যারিকেড বসানো হয়, যার ফলে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করতে পারেননি।
ধর্মীয় নির্দেশনা ও প্রতিবাদ
এ পরিস্থিতিতে আল-আকসার খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি মুসলিমদের মসজিদের নিকটবর্তী স্থানে ঈদের নামাজ আদায়ের আহ্বান জানান। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, নিরাপত্তার অজুহাতে আল-আকসা চত্বরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরায়েল।
যুদ্ধের প্রভাব ও নিরাপত্তা অজুহাত
ইসরায়েল দাবি করছে, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। এর প্রেক্ষিতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই আল-আকসা মসজিদ এলাকায় প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত কেবল নিরাপত্তাজনিত নয়; বরং রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত হিসাবও এতে জড়িত।
জনশূন্য জেরুজালেম, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি
ঈদের দিনে সাধারণত প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা জেরুজালেমের ওল্ড সিটি এবার ছিল অস্বাভাবিক নিরিবিলি। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়, শুধুমাত্র ফার্মেসি ও জরুরি খাদ্যপণ্যের দোকান খোলা ছিল। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এই বিধিনিষেধে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আল-আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে মুসল্লিদের সেখানে যেতে না দেওয়ার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি), আরব লিগ এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন। এক যৌথ বিবৃতিতে সংস্থাগুলো জানায়, এই পদক্ষেপ দখলকৃত জেরুজালেম শহরের ইসলামি ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও আইনি স্থিতাবস্থার গুরুতর লঙ্ঘন।
গাজায় শোকের ঈদ
এদিকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ঈদ উদ্যাপন হয়েছে এক ভিন্ন বাস্তবতায়। চলমান সংঘাতের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহরগুলোতে শোক আর বেদনার মধ্যেই ঈদ পালন করছেন লাখো মানুষ। বাস্তুচ্যুত এক নারী সাদিকা ওমর বলেন, “ঈদের আনন্দ এবার অপূর্ণ। কেউ ঘর হারিয়েছে, কেউ হারিয়েছে পরিবারের সদস্য। তবুও আমরা ধর্মীয় আচার পালনের চেষ্টা করছি।”
সামগ্রিক চিত্র
সব মিলিয়ে, এবারের ঈদ ফিলিস্তিনিদের জন্য হয়ে উঠেছে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিরোধের প্রতীক। আল-আকসায় নামাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু একটি ধর্মীয় ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, পবিত্র এই স্থাপনায় ইবাদতে বাধা প্রদান ফিলিস্তিনি জনগণের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির নতুন বীজ বপন করল।



