
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দুদেশের মধ্যকার শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আলোচনার অগ্রগতি না হওয়ায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বুধবার (২২ এপ্রিল) (যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময়) শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে চলমান আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। হঠাৎ এ যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর পেছনে অজানা কোনো শর্ত পূরণ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে কিনা, তা নিয়েও অনেক বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় খুলে দেওয়া। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্য রপ্তানির জন্য এই প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান প্রথমে দুই সপ্তাহের জন্য সামরিক তত্ত্বাবধানে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে রাজি হলেও পরবর্তীতে অবস্থান পরিবর্তন করে।
শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বৈঠক করেন। তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, এবং ভ্যান্সকে খালি হাতে ওয়াশিংটনে ফিরতে হয়।
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে এবং অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। অপরদিকে, ইরানও পাল্টা অবস্থান নিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধ করে দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সংঘাতের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে ১৬ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ১৯৯৩ সালের পর এই প্রথম সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ এমন চুক্তিতে পৌঁছায়।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েল আত্মরক্ষার স্বার্থে যেকোনো সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাশাপাশি লেবানন সরকারকে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে, যাতে হিজবুল্লাহসহ কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের এই জটিল পরিস্থিতি দ্রুত সমাধান না হলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
ইরানের শক্ত অবস্থান ও পাকিস্তানের ভূমিকা
ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের ঘটনায় আইআরজিসির পাল্টা হুঁশিয়ারির পর নাটকীয়ভাবে হঠাৎ করেই অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই অবরোধের ফলে বুধবার নির্ধারিত আলোচনায় ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এ দিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হওয়ায় ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের জন্য ইসলামাবাদ কাজ চালিয়ে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আশা প্রকাশ করেন, উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে এবং ইসলামাবাদে নির্ধারিত দ্বিতীয় দফার আলোচনায় একটি বিস্তৃত ‘শান্তি চুক্তি’ সম্পন্ন হবে।
তবে মার্কিন নৌ অবরোধ বহাল থাকায়, এই যুদ্ধবিরতি ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে যথেষ্ট হবে কি না তা স্পষ্ট নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার বন্দর অবরোধকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং চলমান যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ইরান তার স্বার্থ রক্ষা এবং নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় সক্ষম।
যদিও প্রকাশ্যে ইরান মার্কিন চাপ প্রত্যাখ্যান করছে, ট্রাম্প দাবি করেছেন তেহরানের নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি রয়েছে, যা কূটনৈতিক অগ্রগতিকে আটকে দিচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শরিফের অনুরোধে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত রেখেছে, যাতে ইরানি নেতৃত্ব একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি নেতৃত্ব গ্রহণ করলেও এখনো জনসমক্ষে আসেননি। তবুও ইরানের ক্ষমতা কাঠামোতে বড় ধরনের ভাঙনের লক্ষণ দেখা যায়নি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুদ্ধ পরিচালনায় সক্রিয় রয়েছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি আলী হাশেম জানিয়েছেন, ইরানি নেতৃত্বে বিভক্তির দাবি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। তাঁর মতে, নতুন নেতৃত্ব ও তাদের ঘনিষ্ঠ মহল দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঐক্য বজায় রাখতে সহায়ক।
অন্যদিকে, ইরান তাদের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার থেকে সরে আসতে নারাজ। সামরিক সক্ষমতা বা আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর প্রশ্নেও তারা অনড়। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়েও বিরোধ তীব্র। ট্রাম্প দাবি করলেও, ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—তারা কোনো অবস্থাতেই ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে যেতে দেবে না।
সার্বিকভাবে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়লেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সূত্র: বিবিসি/ আলজাজিরা



