
ইরানকে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি করে, তবে দেশটির বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে বেইজিং।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, ‘ইরানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট। যদি যুক্তরাষ্ট্র এই মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে চীনের ওপর শুল্ক বাড়ায়, তাহলে চীনও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে’।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তিনজন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ইঙ্গিত দিয়েছে চীন আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরানকে নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরপরই ইরানকে সামরিকভাবে সহায়তা করলে চীনের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প।
রবিবার (১২ এপ্রিল) তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী চীন ইরানকে সহায়তা করছে—এ বিষয়টি যদি সত্য হয়, তাহলে চীন বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়বে। তেহরানকে সামরিক সহায়তা দিলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী বেইজিংয়ের পণ্যের ওপর ‘বিস্ময়কর’ নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে’।
তবে বেইজিংয়ের দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত মিথ্যা প্রতিবেদনের জেরেই ট্রাম্প এই শুল্ক বৃদ্ধি হুমকি দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, চীন সামরিক পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সর্বদা বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করে। একই সঙ্গে আইন-কানুন ও যথাযথ আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।
এ দিকে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ফাঁকে বিদেশি অংশীদারদের সাহায্যে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার আবারও পূর্ণ করার চেষ্টা করছে তেহরান।
দুটি গোয়েন্দা সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, তারা ইঙ্গিত পেয়েছেন চীন এসব অস্ত্র তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। অস্ত্রের প্রকৃত উৎস গোপন রাখতেই সেগুলো সরাসরি পাঠানো হচ্ছে না।
সূত্রের দাবি, ‘ম্যানপ্যাড’ নামক কাঁধ থেকে ছোড়া যায় এমন বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছে বেইজিং। এই ব্যবস্থাগুলো নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া মার্কিন সামরিক বিমানগুলোর জন্য একটি অপ্রতিরোধ্য হুমকি সৃষ্টি করে, যা ৪০ দিনের যুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল ইরান। যুদ্ধবিরতি ভেস্তে গেলে ও আবারো যুদ্ধ শুরু হলে এই অস্ত্র ফের যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাথাব্যথার কারণ হতে পারে।
ইরানের একটি প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার চীন। তেহরানের বেশিরভাগ তেল কিনে থাকে বেইজিং। কিন্তু দেশ দুটির মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তি নেই।
অনেক বিশ্লেষক বলেন, চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ‘প্রধানত তেলের বিনিময়ে অস্ত্র’-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। দেশটি ইরানকে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল, ড্রোন এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করছে। যদিও সঠিক আর্থিক অংক প্রায়ই গোপন রাখা হয়, তবে কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী চীন ইরানকে গোপনে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র সরবরাহ করেছে।
এছাড়া ইরান চীন থেকে ৮০০টি ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ অর্ডার করেছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে হরমুজ পার হলো চীনা জাহাজ
ইসলামাবাদ আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেন। কিন্তু অবরোধের প্রথম দিনেই দেখা গেল, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত একটি চীনা জাহাজ প্রণালি পার হয়ে গেছে।
শাংহাই শুয়ানরুন শিপিং কোম্পানির মালিকানাধীন 'রিচ স্টারি' নামের এই জাহাজটি মালাউইয়ের পতাকাবাহী হলেও চীনা মালিকানাধীন এবং চীনা নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত। ইরানের তেল পরিবহনে জড়িত থাকার কারণে ২০২৩ সালেই জাহাজটিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছিল। জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দর থেকে প্রায় আড়াই লাখ ব্যারেল মেথানল নিয়ে ওমানের সোহার বন্দরের দিকে যাচ্ছিল।
শিপিং ডেটা বিশ্লেষকদের মতে, অবরোধ শুরুর প্রথম দিনে মোট তিনটি জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে, যার মধ্যে দুটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড পরে স্পষ্ট করে বলেছে, অবরোধ শুধু ইরানি বন্দরমুখী বা সেখান থেকে আসা জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সব জাহাজের ক্ষেত্রে নয়।
বিশ্লেষকেরা এই ঘটনাকে ট্রাম্পের অবরোধের একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন। যেখানে ট্রাম্প বলেছিলেন 'সব জাহাজ' আটকানো হবে, বাস্তবে তা হচ্ছে না। শিপিং বিশেষজ্ঞ মার্টিন কেলি জানিয়েছেন, ১৩ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১৪টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে এবং অবরোধের প্রকৃত প্রয়োগ কোথায় হচ্ছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শি জিনপিংয়ের চার দফা প্রস্তাব
অস্ত্র বিতর্ক ও জাহাজ চলাচলের মাঝে বেইজিং শান্তির উদ্যোগেও সক্রিয় রয়েছে। আবুধাবির যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় চার দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন।
প্রস্তাবে শি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে 'শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি' বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া একটি 'টেকসই নিরাপত্তা কাঠামো' গড়ে তোলার কথা বলেছেন, যা মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের অবস্থানকেই প্রতিফলিত করে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনের কর্তৃত্ব সমুন্নত রাখার এবং তা 'নির্বাচিতভাবে' প্রয়োগ না করার দাবি জানিয়েছেন তিনি — যা স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরোক্ষ সমালোচনা। শি বলেছেন, "আন্তর্জাতিক আইনের কর্তৃত্ব রক্ষা করতে হবে; এটি নির্বাচিতভাবে বা সুবিধামতো প্রয়োগ করা যাবে না।'
এর আগে মার্চ মাসের শেষে চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে পাঁচ দফা শান্তি উদ্যোগ ঘোষণা করেছিল। সেই প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। আফ্রিকান ইউনিয়ন এই উদ্যোগকে "সময়োপযোগী ও গঠনমূলক" বলে স্বাগত জানিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন চীনের মধ্যস্থতায় খুব একটা আগ্রহী নয়। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ড্যানি রাসেল চীনের কূটনৈতিক তৎপরতাকে "আনুষ্ঠানিকতামাত্র" বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইরান প্রশ্নে চীনের পাঁচ দফা প্রস্তাবকে ২০২৩ সালে ইউক্রেন নিয়ে দেওয়া ১২ দফার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা ছিল কথার ফুলঝুরিমাত্র।
হরমুজ অবরোধকে 'বিপজ্জনক' বললো বেইজিং
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন নৌ অবরোধকে "বিপজ্জনক ও দায়িত্বহীন কাজ" বলে নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেছেন, অতিরিক্ত মার্কিন সামরিক মোতায়েন ও লক্ষ্যভিত্তিক অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করবে এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
চীনের স্বার্থও এখানে সরাসরি জড়িত। ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কেনে চীন। প্রণালি বন্ধ থাকায় চীনের জ্বালানি আমদানিতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের মুখে ইতিমধ্যেই চাপে থাকা চীনের অর্থনীতিতে এই জ্বালানি সংকট নতুন মাত্রার ধাক্কা দিচ্ছে।
এপ্রিল ৭ তারিখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাহরাইনের উপস্থাপন করা একটি খসড়া প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া ভেটো দিয়েছে। প্রস্তাবটিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাহারা দিতে বলপ্রয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছিল। চীনের যুক্তি ছিল, প্রস্তাবটি সংঘাতের মূল কারণ ও পুরো চিত্রকে সঠিকভাবে তুলে ধরেনি।
পরিস্থিতি যত জটিল হচ্ছে, চীনের ভূমিকাও তত বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ইরানের বড় তেল ক্রেতা, সম্ভাব্য অস্ত্র সরবরাহকারী, শান্তির মধ্যস্থতাকারী এবং মার্কিন অবরোধের সমালোচক — চীন এই সংকটে এতগুলো ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে যে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরান সংকটকে বেইজিং মূলত বৈশ্বিক নেতৃত্বে নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।



