
ইরানের খারগ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্রে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী সুরক্ষিত করতে মিত্র দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, তেহরান তাদের জবাব জোরদার করার প্রতিজ্ঞা করেছে। সব মিলিয়ে রবিবারও যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন হামলায় খারগ দ্বীপের অধিকাংশ এলাকা "সম্পূর্ণ ধ্বংস" হয়ে গেছে। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "আমরা হয়তো নিছক মজার ছলে (just for fun) আরও কয়েকবার সেখানে আঘাত হানব।" তিনি উল্লেখ করেন, তেহরান সংঘাত অবসানে চুক্তির জন্য প্রস্তুত মনে হলেও "শর্তগুলো এখনো যথেষ্ট ভালো নয়।"
প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য তাঁর আগের বক্তব্যের চেয়েও কঠোর এবং উত্তেজনাকর, যেখানে তিনি বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক স্থাপনায় হামলা করেছে। রয়টার্সকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, যা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তেল ও গ্যাসের প্রধান চ্যানেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার তেহরানের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে তেল সরবরাহে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিঘ্ন ঘটায় জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, "বিশ্বের যেসব দেশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল গ্রহণ করে, তাদের অবশ্যই ওই পথের দায়িত্ব নিতে হবে, আর আমরা সাহায্য করব—প্রচুর!" তিনি আরও বলেন, "সবকিছু যাতে দ্রুত, সুষ্ঠু ও ভালোভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র ওই দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে।"
সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে গড়ালেও উভয় পক্ষই দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ইরান কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিরতি নেই। ইরানি বাহিনী তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি প্রধান জ্বালানি কেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এর আগে শুক্রবার রাতে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের ইরাক ছাড়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে।
সরকার ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ২,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ইরানি। শনিবার আধা-সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সি জানায়, মধ্য ইরানের ইসফাহান শহরে একটি রেফ্রিজারেটর ও হিটার কারখানায় বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন।
ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর ও ডক এলাকা এবং "আমেরিকান গোপন আস্তানা" থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে, ওই সব এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়েছে। তবে আমিরাত অস্বীকার করেছে যে শুক্রবার রাতে খারগ দ্বীপে তাদের ভূখণ্ড থেকে হামলা চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো স্থাপনাকে "বৈধ লক্ষ্যবস্তু" আখ্যা দিয়ে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ওই অঞ্চল থেকে সব মার্কিন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
তেলের বাজারের অস্থিরতা সহসা কমার লক্ষণ নেই। ড্রোন হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ আমিরাতে (যা জাহাজ রিফুয়েলিংয়ের বৈশ্বিক কেন্দ্র) তেল লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প ও বাণিজ্য সূত্রগুলো। আমিরাতের মিডিয়া অফিস একটি ড্রোন প্রতিহত করার দাবি করলেও, ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী তা নেভানোর চেষ্টা করছে।
ট্রাম্প সপ্তাহান্তটি ফ্লোরিডায় তাঁর মার-এ-লাগো রিসোর্টে কাটিয়েছেন। এনবিসি সাক্ষাৎকার এবং ট্রুথ সোশ্যালে কয়েকটি পোস্ট ছাড়া জনসমক্ষে তাঁকে খুব একটা দেখা যায়নি। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আশা প্রকাশ করেন যে চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেনসহ অন্যরা হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দেশ এতে সাড়া দেয়নি।
ফরাসি কর্মকর্তারা শুক্রবার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তারা হরমুজ প্রণালীর সুরক্ষায় একটি জোট গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শনিবার বলেছেন, "আমরা আগেই বলেছি, ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছি।"
নিহত পিতার স্থলাভিষিক্ত হওয়া সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকা উচিত। অন্যদিকে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সেই জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন যে খামেনি আহত বা বিকলাঙ্গ হয়েছেন। আরাঘচি বলেন, "নতুন সর্বোচ্চ নেতার কোনো সমস্যা নেই। তিনি গতকাল তাঁর বার্তা পাঠিয়েছেন এবং তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করবেন।" উল্লেখ্য, খামেনি প্রকাশ্যে আসেননি, বরং বৃহস্পতিবার টিভিতে তাঁর একটি বিবৃতি পাঠ করা হয়।
খারগ দ্বীপের ক্ষয়ক্ষতি
ইরান খারগ দ্বীপের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম করে দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা উপসাগরের ইরান উপকূল থেকে ১৫ মাইল (২৪ কিমি) দূরে অবস্থিত ওই দ্বীপে জ্বালানি শিল্প নয়, বরং সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা খারগ দ্বীপে নৌ মাইন স্টোরেজ, মিসাইল বাংকারসহ ৯০টিরও বেশি স্থানে হামলা চালিয়েছে।
আরাঘচি বলেছেন, জ্বালানি স্থাপনায় যেকোনো হামলার জবাব দেবে ইরান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার ইরান থেকে আমিরাতের দিকে ৯টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ৩৩টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। ইরান দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর, আবুধাবির খলিফা বন্দর এবং ফুজাইরাহ বন্দরের আশপাশ থেকে বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছে এবং জানিয়েছে তারা উপসাগরে মার্কিন ব্যাংকের শাখাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত ফুজাইরাহ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল আমিরাতের মুরবান অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়, যা বিশ্ব চাহিদার প্রায় ১ শতাংশের সমান।
সূত্র : রয়টার্স
আরটিএনএন/এআই



