ইরান, ট্রাম্প, খামেনি
তেহরানে ইরানের জাতীয় পতাকা হাতে নতুন সর্বোচ্চ নেতার সমর্থনে আয়োজিত এক সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা সমবেত হয়েছিলেন।ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে বিমান হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য কী? তিনি কি কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শন করতে চান, নাকি ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাই তার প্রকৃত উদ্দেশ্য?

যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের প্রায় দুই হাজারের মতো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক ঘাঁটি, তেল শোধনাগার ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

এই হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, যা সংঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তার মৃত্যুর পর দ্রুতই ইরান নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করে।

অন্যদিকে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল ও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত এক হাজারের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি স্কুলে বোমা হামলায় শতাধিক শিশুর মৃত্যু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে কয়েকজন মার্কিন সেনাও নিহত হয়েছেন।

যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানের পথ দেখা যাচ্ছে না।

মার্কিন প্রশাসন সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসক পরিবর্তনের কথা না বললেও অনেক বিশ্লেষকের মতে, তাদের সামরিক পদক্ষেপ সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে দুর্বল করে দেশের ভেতরে গণঅভ্যুত্থান তৈরি করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে বাস্তবে শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু সত্ত্বেও ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় কোনো ভাঙন দেখা যায়নি।

বরং নতুন নেতা ঘোষণার পর দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে এক ধরনের দ্বৈততা দেখা গেছে। একদিকে তারা ইরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছে, অন্যদিকে কঠোর সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

শুরুতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণের বিনিময়ে দায়মুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা প্রতিরোধ জোরদার করেছে।

মার্কিন প্রশাসন বারবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করার কথা বলেছে। ইতোমধ্যে ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শুধুমাত্র সামরিক হামলা দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। কারণ কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বোমা হামলার মাধ্যমে বদলে দেওয়া বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্থল অভিযান চালাবে কি না— সেটিও এখন আলোচনার বিষয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় পূর্ণাঙ্গ স্থল যুদ্ধ শুরু করা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কঠিন হতে পারে।

কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধের পরিণতি হতে পারে একটি ‘জোরপূর্বক সমঝোতা’। অর্থাৎ সামরিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হতে পারে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুদ্ধ কতদিন চলবে বা এর শেষ কোথায়— তা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সূত্র: আলজাজিরা