
শনিবার একটি তেলের ডিপোতে হামলাসহ ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বড় পরিসরে বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে এই সংঘাত সম্প্রসারিত হয়ে লেবানন, ইরাক এবং উপসাগরীয় (গালফ) অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান বলেছে, যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হবে। শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ড ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হওয়া পর্যন্ত তাদের ওপর হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও, ইসরায়েল এবং কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরান তাদের প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত রেখেছে।
যুদ্ধের নবম দিনে সার্বিক পরিস্থিতি যেমন:
ইরান পরিস্থিতি
- সামরিক হামলা ও ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বড় পরিসরে হামলা অব্যাহত রেখেছে এবং প্রথমবারের মতো দেশটির তেল মজুতগার ও শোধনাগারগুলোতে আঘাত হেনেছে। শনিবার গভীর রাতে তেহরানের উপকণ্ঠে শেহরান তেলের ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও ধারণ করেছে স্থানীয় গণমাধ্যম। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সাথে যুক্ত জ্বালানি মজুতগার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে তারা হামলা চালিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১,৩৩২ জন নিহত হয়েছেন।
- যুক্তরাষ্ট্রের দাবি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছ থেকে "নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ"-এর দাবি অব্যাহত রেখেছেন। শনিবার গভীর রাতে তিনি বলেন যে, যুদ্ধ আরও "কিছুকাল" চলবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে কোনো "সমঝোতা" করতে চাইছে না।
- নৌ-হুমকি ও চলাচল: ইরানি সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে। তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী যেকোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি জাহাজকে তারা লক্ষ্যবস্তু করবে। শনিবার প্রণালি দিয়ে জাহাজের চলাচল না থাকার বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে ট্রাম্প বলেন, এটি জাহাজগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। সেইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, ওয়াশিংটন ইরানের নৌবাহিনীকে "নিশ্চিহ্ন" করে দিয়েছে।
- প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক: প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে তেহরান প্রতিবেশী ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক চায়। তিনি বলেন, শত্রুরা বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রোববার রাষ্ট্রীয় টিভিতে বলা হয়, পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন—তার বক্তব্যকে "শত্রুরা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছে, যারা প্রতিবেশীদের সাথে বিভেদ তৈরি করতে চায়"। উপসাগরীয় দেশগুলো যখন ইরান থেকে ড্রোন হামলার খবর দিচ্ছে, ঠিক তখনই তার এই মন্তব্য সামনে এলো।
- ইরানের নতুন নেতৃত্ব: ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদের (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ-মেহদি মিরবাঘেরি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের সিদ্ধান্তটি প্রায় চূড়ান্ত। টেলিগ্রামে ফারস সংবাদ সংস্থার পোস্ট করা একটি ভিডিওতে মিরবাঘেরি বলেন, "নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা" চালানো হয়েছে এবং "একটি চূড়ান্ত ও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে" পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
- যুদ্ধাপরাধ: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, দক্ষিণ ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৬০ জন নিহতের ঘটনাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত; নিহতদের অনেকেই ছিল ওই স্কুলের শিক্ষার্থী। আল জাজিরার তদন্তেও দেখা গেছে, স্কুলটিকে সম্ভবত "ইচ্ছাকৃতভাবেই" লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। অন্যদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হামলাটি সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রই চালিয়েছে।
- গোয়েন্দা প্রতিবেদন: ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে—যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন "বড় পরিসরের" হামলাতেও ইরানের ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটার সম্ভাবনা নেই। এছাড়া প্রতিবেদনে ইরানের বিভক্ত বিরোধী দলগুলোর দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনাকেও "অসম্ভব" বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
- তেল বাণিজ্য: এই যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে টালমাটাল করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের মাত্র এক সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের (অপরিশোধিত তেল) দাম ২৭ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পরিস্থিতি
- বাহরাইন: দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের ড্রোন হামলায় বাহরাইনের একটি পানি বিশুদ্ধকরণ (ডেসালিনেশন) প্ল্যান্টের বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছিলেন, দক্ষিণ ইরানের কেশম দ্বীপে একটি স্বাদু পানির প্ল্যান্টে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি "নতুন নজির" স্থাপন করেছে। বাহরাইনের বিবৃতির পর ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, উপসাগরীয় দেশগুলোর বেশিরভাগই তাদের নাগরিকদের পানির চাহিদার জন্য এই বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
- কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত: প্রতিবেশী দেশগুলোতে কোনো হামলা না চালানোর বিষয়ে ইরানের প্রেসিডেন্টের আশ্বাস সত্ত্বেও এই তিনটি দেশ তাদের ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর দিয়েছে। কুয়েত জানিয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে তাদের দুই সীমান্তরক্ষী নিহত হয়েছেন। এছাড়া তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যালয়ে হামলায় আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
- সৌদি আরব: দেশটি জানিয়েছে, রিয়াদের কূটনৈতিক এলাকায় একটি হামলা নস্যাৎ করা হয়েছে এবং তাদের আকাশসীমায় বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
- গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি): জিসিসি বলেছে, বাহরাইন ও কুয়েতের বিরুদ্ধে ইরানের অব্যাহত হামলা "বিপজ্জনক আগ্রাসন", যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এই জোটে রয়েছে বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।
- বিমান চলাচল ও ফ্লাইট আপডেট: আঞ্চলিক আকাশসীমা বন্ধ এবং ব্যাপক ফ্লাইট বাতিলের পর, কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশেষ "জরুরি রুট" ব্যবহার করে আংশিকভাবে বিমান চলাচল পুনরায় শুরু করেছে। কাতার এয়ারওয়েজ রোববার লন্ডন, প্যারিস, মাদ্রিদ, রোম, ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং ব্যাংকক থেকে দোহায় বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করেছে। বিমানবন্দরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই সবগুলো ফ্লাইট নিরাপদে অবতরণ করেছে।
ইসরায়েল পরিস্থিতি
- ইরানি হামলা: ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরান ইসরায়েলের দিকে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। নেগেভ মরুভূমিসহ দক্ষিণ ইসরায়েলে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে।
- ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই সর্বশেষ হামলাটিকে "অপারেশন ট্রু প্রমিস-এর ২৭তম দফা" হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি
- যুদ্ধের সময়সীমা: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ আরও "কিছুকাল" চলবে এবং এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্য "অবিশ্বাস্য রকম ভালোভাবে" এগোচ্ছে। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এই সামরিক অভিযান চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে।
- মার্কিন সেনা হতাহত: যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলায় নিহত ছয় মার্কিন সেনার কফিন দেশে পৌঁছেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে ট্রাম্প নিহত সেনাদের এই মরদেহ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। এই সেনাদের মৃত্যুকে তিনি আমেরিকানদের জন্য একটি "অত্যন্ত দুঃখের দিন" বলে আখ্যায়িত করেন।
- পেন্টাগন প্রধানের হুমকি: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইরানকে নতুন করে হুমকি দিয়েছেন। এক্সে (X) তিনি লেখেন, "আপনারা যদি আমেরিকানদের হত্যা করেন, যদি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে আমেরিকানদের হুমকি দেন, তবে আমরা বিনা দ্বিধায় ও বিনা ক্ষমাপ্রার্থনায় আপনাদের খুঁজে বের করব এবং হত্যা করব।"
- পারমাণবিক মজুত: অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখলে নিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল বিশেষ বাহিনী (স্পেশাল ফোর্সেস) মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে। সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এই অভিযানটি সম্ভবত যুদ্ধের "পরবর্তী কোনো ধাপে" পরিচালিত হতে পারে।
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই



