
জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লেবাননের পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকার নবি চিত শহরে ইসরায়েলের বিমান ও স্থল হামলায় অন্তত ৪১ জন নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়েছেন। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নিতে গত সোমবার ইরানপন্থী লেবানিজ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের মাধ্যমে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর থেকে ইসরায়েল অসংখ্য প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননে স্থল সেনা পাঠিয়েছে। তবে এর আগে তারা পূর্বাঞ্চলের এতটা গহিনে বা উত্তরাংশে কোনো অভিযান চালায়নি।
লেবাননের সরকারি সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সির (এনএনএ) মতে, রাতে "অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে" ইসরায়েলি কমান্ডোদের একটি দল নবি চিত শহরের পূর্বাঞ্চলের একটি পারিবারিক কবরস্থানের দিকে অনুপ্রবেশ করে। সংবাদমাধ্যমটি জানায়, "প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে পড়ার পর হালকা ও মাঝারি অস্ত্রধারী ওই কমান্ডোদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়।" তারা আরও জানায়, ইসরায়েলি সেনাদলটি ধরা পড়ার পর যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার ব্যাপকভাবে সেখানে হস্তক্ষেপ করে এবং প্রায় ৪০টি হামলা চালায়।
এনএনএ-এর মতে, এই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে লেবাননের সেনাবাহিনীর অন্তত তিন সেনা এবং জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের একজন সদস্য রয়েছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে উত্তরাঞ্চলীয় শহর বাত্রুন থেকে বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে হিজবুল্লাহর এক সদস্য ইমাদ আমহাজকে আটক করার পর, এটিই লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি বাহিনীর সবচেয়ে গভীর অনুপ্রবেশের ঘটনা।
এদিকে এনএনএ জানিয়েছে, লেবানন-সিরিয়া সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর অবতরণের চেষ্টার সময় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তাদের যোদ্ধারা এই সংঘর্ষে যুক্ত ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের একটি তীব্র রণাঙ্গন হিসেবে এই এলাকাটি এখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
'সিরিয়ার দিক থেকে অনুপ্রবেশ'
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, এই অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে পূর্বাঞ্চলীয় বালবেক জেলার নবি চিতে, যেখানে হিজবুল্লাহর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ বলেছে, তাদের যোদ্ধারা "সিরিয়ার দিক থেকে ইসরায়েলি শত্রু বাহিনীর চারটি হেলিকপ্টারকে অনুপ্রবেশ করতে দেখেছে।"
হিজবুল্লাহ জানায়, অবতরণের পর অগ্রসর হওয়া সৈন্যরা নবি চিতে কবরস্থানে পৌঁছালে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের একটি দলের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। তারা আরও জানায়, "শত্রুবাহিনী ধরা পড়ার পর সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়।" ইসরায়েলি সেনারা তখন তীব্র হামলা চালিয়ে এলাকা ছাড়তে শুরু করে।
একটি পৃথক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটার সময় হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা তাদের ওপর রকেট হামলা চালায়। গোষ্ঠীটি জানায়, তাদের যোদ্ধারা "নবি চিত শহরের উপকণ্ঠে সেনা প্রত্যাহারের এলাকাটি লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে।" সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে আকাশে মুহুর্মুহু গুলির দৃশ্য দেখা গেছে।
এনএনএ-এর তথ্যমতে, গত শুক্রবার নবি চিতে অন্তত ১৩ বার ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ৯ জন নিহত হওয়ার কথা জানায় লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শনিবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, ১৯৮৬ সাল থেকে নিখোঁজ থাকা বৈমানিক রন আরাদের দেহাবশেষ খুঁজতে তারা লেবাননে একটি অভিযান চালিয়েছিল, তবে তার কোনো সন্ধান তারা পায়নি।
সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক নামের সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করে এক বিবৃতিতে বলা হয়, "লেবাননে আইডিএফ-এর (ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস) কার্যক্রমের অংশ হিসেবে, নিখোঁজ বৈমানিক রন আরাদ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ সন্ধানের উদ্দেশ্যে আইডিএফ স্পেশাল ফোর্সেস রাতের বেলা একটি অভিযান পরিচালনা করে। এতে আইডিএফ-এর কোনো সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।" বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "তল্লাশির স্থানে তার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।"
শনিবার লেবানন সীমান্তের নিকটবর্তী উত্তর ইসরায়েলের একটি শহরের বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হিজবুল্লাহ। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, "সতর্কবার্তা। কিরিয়াত শমোনা শহরের সকল বাসিন্দাকে অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আপনারা দক্ষিণের দিকে যান।"
অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনকে সতর্ক করে বলেছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে ব্যর্থ হলে তার দেশটিকে "অনেক বড় মূল্য" চোকাতে হবে। ইসরায়েলি টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে কাৎজ বলেন, "যদি আমাদের সামনে নিজেদের বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অথবা লেবাননকে রক্ষা করা—এই দুটি বিকল্প থাকে, তবে আমরা নিজেদের নাগরিক ও সেনাদের রক্ষাকেই বেছে নেব। এর ফলে লেবানন ও দেশটির সরকারকে চরম মূল্য দিতে হবে।"
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহর হামলা অব্যাহত
লেবানন সরকার গত সোমবার হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, তবে এর যোদ্ধারা ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে। পূর্ব লেবাননের বেকা উপত্যকা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক জেইনা খোদর জানান, হিজবুল্লাহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাদের সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ায় লেবানন সরকার একটি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, "মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও লেবাননের সেনাবাহিনী দাবি করেছিল যে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।" খোদর জোর দিয়ে বলেন, "ওই সীমান্ত গ্রামগুলোতে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সম্মুখ সমরে থাকা এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে হিজবুল্লাহই সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী।"
বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিগুলো কয়েক দিন ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরামহীন বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে। এর ফলে দাহিয়েহর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে বাধ্য হয়ে হাজার হাজার মানুষ ব্যাপকভাবে পালিয়ে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দক্ষিণ লেবাননেও বড় পরিসরে জোরপূর্বক উচ্ছেদের হুমকি দেয়, যার ফলে ওই এলাকাগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষ ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়।
শুক্রবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৯৪-এ দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আরও ১ হাজার ২৩ জন আহত এবং প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম বলেছেন, "মানবিক ও রাজনৈতিক স্তরে এই বাস্তুচ্যুতির পরিণতি নজিরবিহীন হতে পারে।" তিনি আরও বলেন, "আমাদের দেশ এমন একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়া হয়েছে, যা আমরা চাইনি এবং বেছেও নিইনি।"
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই



