
উত্তর ইসরায়েলের হাইফায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে হিজবুল্লাহ রকেট ও ড্রোন হামলা চালানোর পর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বোমাবর্ষন করেছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। সোমবার ভোরে ইরান-সমর্থিত লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠীটি জানায়, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এবং "লেবানন ও তার জনগণকে রক্ষা" করতে তারা এই হামলা চালিয়েছে। এছাড়া "ইসরায়েলের ক্রমাগত আগ্রাসনের জবাব" হিসেবেও এই হামলাকে অভিহিত করা হয়েছে।
লেবাননে ইসরায়েলের প্রায় নিত্যদিনের হামলার প্রসঙ্গ টেনে এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি বলেছে, "প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতৃত্ব সবসময়ই বলে এসেছে যে, ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত রাখা এবং আমাদের নেতা, যুবসমাজ ও জনগণকে হত্যা—আমাদের আত্মরক্ষার এবং উপযুক্ত সময় ও স্থানে জবাব দেওয়ার অধিকার দেয়।"
তারা আরও বলে, "ইসরায়েলি শত্রু কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই তাদের পনেরো মাসব্যাপী আগ্রাসন চালিয়ে যেতে পারে না। এই আগ্রাসন বন্ধ করতে এবং দখলকৃত লেবানিজ ভূখণ্ড থেকে তাদের সরে যেতে বাধ্য করার জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা।" এই সংঘাতের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে, যা একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্রদের মধ্যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।
হিজবুল্লাহ লেবানিজ সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ২০২৪ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় গোষ্ঠীটির অধিকাংশ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা নিহত হওয়ার পর তারা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমান সংঘাতে তারা ইসরায়েলের কতটা ক্ষতি করতে পারবে কিংবা ইরানের পক্ষে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েল দ্রুতই দক্ষিণ বৈরুতে বিমান হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি গ্রাম এবং দেশের পূর্বাঞ্চলীয় বেকা উপত্যকাতেও ইসরায়েলি হামলার খবর দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা পুরো লেবাননজুড়ে "হিজবুল্লাহর ওপর জোরালো আক্রমণ" চালাচ্ছে।
ইসরায়েলি বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, "হিজবুল্লাহর যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে [ইসরায়েলি সেনাবাহিনী] পদক্ষেপ নেবে এবং এই সংগঠনটিকে [ইসরায়েলের] জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে বা উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষতি করতে দেবে না।" বিবৃতিতে আরও বলা হয়, "সন্ত্রাসী সংগঠন হিজবুল্লাহ লেবানন রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছে। এই উত্তেজনা বৃদ্ধির দায় তাদেরই এবং [ইসরায়েলি সেনাবাহিনী] এই ক্ষতির কড়া জবাব দেবে।"
পরবর্তীতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করে যে, তারা বৈরুত এলাকায় হিজবুল্লাহর "জ্যেষ্ঠ" সদস্যদের এবং দক্ষিণ লেবাননে একজন "মূল" ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, তবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকার বিন্ট জবেইল শহরসহ ৫০টিরও বেশি গ্রামের বাসিন্দাদের তাদের ঘরবাড়ি খালি করার এবং ভবনগুলো থেকে অন্তত ১ কিলোমিটার (০.৬ মাইল) দূরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এত বিশাল এলাকাজুড়ে দেওয়া এই সতর্কবার্তা গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় দেওয়া গণ-বাস্তুচ্যুতির আদেশের মতোই মনে হচ্ছে। এই উত্তেজনা লেবাননের সংকটকে আরও গভীর করতে পারে, যে দেশটি বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত।
হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছেছিল, কিন্তু ইসরায়েল সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে প্রায় প্রতিদিন লেবাননজুড়ে হামলা চালিয়ে আসছে। লেবানিজ গোষ্ঠীটি এতদিন ইসরায়েলি হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত করা থেকে বিরত ছিল এবং লেবানিজ সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে দেশ রক্ষার আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
বৈরুত কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরায়েলি লঙ্ঘন বন্ধে চাপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে আসলেও কোনো ফল হয়নি। জানুয়ারি মাসে বৈরুত জাতিসংঘের কাছে একটি অভিযোগ দায়ের করে, যেখানে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে লেবাননের সার্বভৌমত্বে ২০৩৬ বার ইসরায়েলি লঙ্ঘনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গত বছর লেবানিজ সরকার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য একটি ডিক্রি বা আদেশ জারি করেছিল, কিন্তু গোষ্ঠীটি সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। তাদের যুক্তি ছিল, ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদ বা আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করতে তাদের অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে।
সোমবার লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর এই হামলাকে "দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সন্দেহজনক কাজ" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এটি "লেবাননের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকে বিপন্ন করে এবং ইসরায়েলকে তাদের আগ্রাসন অব্যাহত রাখার অজুহাত তৈরি করে দেয়।" সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ সালাম বলেন, "আমরা দেশকে নতুন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ বা দুঃসাহসিক অভিযানে জড়াতে দেব না। অপরাধীদের ধরতে এবং লেবানিজ জনগণকে রক্ষা করতে আমরা সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।"
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই



