
দ্বিতীয় দফা পরমাণু আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হুমকি দিয়েছে। অন্যদিকে, ওই অঞ্চলে যেকোনো "একতরফা পদক্ষেপ" প্রতিহত করতে ওমান সাগরে যৌথ নৌ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান ও রাশিয়া। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরোক্ষ আলোচনা কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে "চুক্তি করা ইরানের জন্য খুবই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।" লেভিট সাংবাদিকদের বলেন, মঙ্গলবার কিছুটা অগ্রগতি হলেও "কিছু বিষয়ে আমরা এখনও অনেক দূরে অবস্থান করছি।"
ট্রাম্প—যিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী এবং হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছেন—সামাজিক মাধ্যমে তাঁর সুর আরও চড়া করেছেন। তাঁর 'ট্রুথ সোশ্যাল' প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, "ইরান যদি চুক্তি না করার সিদ্ধান্ত নেয়," তবে "অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক একটি শাসনের সম্ভাব্য হামলা নির্মূল করতে" যুক্তরাষ্ট্রকে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের ভারত মহাসাগরীয় বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে হতে পারে।
গত বছর ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন পূর্ববর্তী আলোচনা ভেস্তে গিয়েছিল। সেই হামলা ১২ দিনের যুদ্ধের সূত্রপাত করেছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়ে ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানে ইরানের তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা বর্ষণ করেছিল।
জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরানের প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের পর ট্রাম্প নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। জবাবে তেহরান উপসাগরীয় তেলের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছিল। এই পাল্টাপাল্টি হুমকি আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয় এবং ওমান, কাতার ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে বাধ্য করে।
আলোচনার মূলনীতি
৬ ফেব্রুয়ারি ওমানে প্রথম দফা পরোক্ষ আলোচনার পর মঙ্গলবার জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফায় মিলিত হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, দুই পক্ষ সম্ভাব্য চুক্তির জন্য "গাইডিং প্রিন্সিপালস" বা মূলনীতিতে একমত হয়েছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, তেহরান এখনও ওয়াশিংটনের সব 'রেড লাইন' বা সীমারেখা মেনে নেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানকে তার মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্যাগ করতে হবে এবং তারা আলোচনার পরিধি বাড়িয়ে তাতে মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পারমাণবিক নয় এমন বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। ইরান জোর দিয়ে বলছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং তারা কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে রাজি। তারা শূন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
কূটনীতি পুনরায় শুরু হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে। ট্রাম্প ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, প্রথমটি—‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং এর প্রায় ৮০টি বিমান—রবিবার পর্যন্ত ইরানি উপকূল থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার (৪৩৫ মাইল) দূরে অবস্থান করছিলো।
ইরানও তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। "সম্ভাব্য নিরাপত্তা ও সামরিক হুমকি" মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সোমবার ও মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালীতে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) একাধিক যুদ্ধ মহড়া চালিয়েছে।
ইরান-রাশিয়া মহড়া
বুধবার তেহরান ওমান সাগরে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন যৌথ নৌ মহড়ার ঘোষণাও দিয়েছে। রিয়ার অ্যাডমিরাল হাসান মাকসুদালু বলেন, বৃহস্পতিবারের এই মহড়ার উদ্দেশ্য হলো "আঞ্চলিক দেশগুলোকে শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা দেওয়া।" তিনি আরও বলেন, এর লক্ষ্য হলো "অঞ্চলে যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ প্রতিরোধ করা" এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল ট্যাঙ্কারের ঝুঁকি সহ সামুদ্রিক নিরাপত্তার হুমকির বিরুদ্ধে সমন্বয় বাড়ানো।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার জিএমটি ০৩:৩০ থেকে ১৩:৩০ পর্যন্ত দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে রকেট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বিমান চালকদের সতর্কবার্তা (notice to airmen) জারি করেছে। এদিকে, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সতর্ক করে বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হামলা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে। তিনি তেহরানকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে সংযত হয়ে সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান।
সৌদি আরবের আল-আরাবিয়া টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাভরভ বলেন, "এর পরিণতি ভালো হবে না। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে ইতিমধ্যে হামলা হয়েছে। আমরা যা বুঝতে পারছি, তাতে পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রকৃত ঝুঁকি ছিল।"
তিনি আরও বলেন, উত্তেজনা বাড়লে ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের সাম্প্রতিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, "কেউ উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। সবাই বোঝে এটা আগুন নিয়ে খেলা।"
রুবিও ইসরায়েল সফর করবেন
রয়টার্স এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, জেনেভা আলোচনায় ইরান ওয়াশিংটনের উদ্বেগ নিরসনে একটি লিখিত প্রস্তাব জমা দিতে সম্মত হয়েছে। কর্মকর্তা জানান, বুধবার হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে শীর্ষ মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা বৈঠক করেছেন এবং তাঁদের জানানো হয়েছে যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন সব মার্কিন বাহিনী শীঘ্রই প্রস্তুত হয়ে যাবে।
ওই জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, "প্রেসিডেন্ট ওই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে দ্বিতীয় ক্যারিয়ার গ্রুপও রয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাহিনী মোতায়েন হয়ে যাবে।" কর্মকর্তা আরও জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ইরান নিয়ে আলোচনার জন্য বৈঠক করবেন।
এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান (Kan) জানিয়েছে, ইসরায়েল এমন সম্ভাবনার প্রস্তুতি নিচ্ছে যে ওয়াশিংটন ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেমে হামলার সবুজ সংকেত দিতে পারে। স্টিমসন সেন্টারের ফেলো বারবারা স্লাভিন বলেন, তিনি আশা করছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আরও হামলা চালাবে, সম্ভবত খুব শীঘ্রই।
তিনি বলেন, "উদ্দেশ্য কী, তা আমাদের এখনও দেখার বাকি। এটি কি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? অন্যরা কি এতে জড়িয়ে পড়বে? এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যার উত্তর আমাদের কাছে নেই।" তিনি আরও যোগ করেন, "সত্যি বলতে, আমি এখনও চুক্তির কোনো ভিত্তি দেখছি না। মনে হচ্ছে না এই আলোচনা খুব বিস্তারিত ছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী ছিল... আর আমাদের এই বিশাল সৈন্য সমাবেশও চলছে। তাই আমি খুবই উদ্বিগ্ন।" তিনি বলেন, "আমরা সবাই আগামী কয়েকদিন খুব উদ্বেগের সঙ্গে খবরের দিকে নজর রাখব।"
সূত্র : আল জাজিরা
আরটিএনএন/এআই



