গাজা, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল, জেসি জ্যাকসন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত নাগরিক অধিকার নেতা জেসি জ্যাকসনছবি: সংগৃহীত

চল্লিশ বছরেরও বেশি আগে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত নাগরিক অধিকার নেতা জেসি জ্যাকসন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি এক উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দলটি যেন তাদের দরজা খুলে দেয় এবং স্বাগত জানায় সেই সব মানুষকে—যারা "হতাশ, অভিশপ্ত, অধিকারবঞ্চিত, অসম্মানিত এবং অবহেলিত"। এই তালিকার মধ্যে ছিলেন আরব আমেরিকান এবং ফিলিস্তিনি অধিকারের সমর্থকরাও, যারা দশকের পর দশক ধরে বর্ণবাদ, বিদ্বেষ এবং কোণঠাসা হয়ে থাকার যন্ত্রণায় ভুগেছেন। ওই কমিউনিটির অধিকারকর্মীরা বলছেন, মঙ্গলবার ৮৪ বছর বয়সে মারা যাওয়া জেসি জ্যাকসন তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তাদের কণ্ঠস্বরকে জোরালো করতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন।

আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের (AAI) নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি বলেন, "রেভারেন্ড জ্যাকসন আমাদের জন্য যে পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন, তা না বুঝে আরব আমেরিকানদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের গল্প বলা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।"

১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রচারণার সময় জ্যাকসন আরব আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্ট জেমস জগবিকে তার অন্যতম ডেপুটি ক্যাম্পেইন ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এই জগবিই পরবর্তীতে AAI প্রতিষ্ঠা করেন।

জ্যাকসনের প্রচারণা দল আরব আমেরিকানদের সক্রিয়ভাবে কাছে টেনেছিল এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে জোরালো করেছিল। তিনি এমন এক যুগে এই সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, যখন মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলকে প্রশ্নাতীত সমর্থন দেওয়াই ছিল স্বাভাবিক রীতি।

মায়া বেরি জানান, যারা ফিলিস্তিনকে একটি মূল ইস্যু হিসেবে দেখেন, সেই সব আরব আমেরিকানদের থেকে দূরে থাকার জন্য জ্যাকসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলেও তিনি তা সর্বদা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল জাজিরাকে বেরি বলেন, "তিনি (জ্যাকসন) বুঝতেন যে, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াইটা কঠিন হোক বা সহজ—যেকোনো পরিস্থিতিতেই তা চালিয়ে যেতে হয়। আমাদের দেশ একজন মহিরুহকে হারাল।"

দলীয় ইশতেহার প্রসঙ্গ

১৯৮৮ সালে জ্যাকসন দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় নামেন। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে তিনি মিশিগান এবং দক্ষিণাঞ্চলের অনেকটা অংশসহ ১৩টি রাজ্যে জয়ী হন। শেষ পর্যন্ত তিনি ম্যাসাচুসেটসের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল ডুকারকিসের কাছে মনোনয়ন হারান। তবুও, জ্যাকসনের সেই প্রচারণা ফিলিস্তিনি অধিকারের বিষয়টিকে মার্কিন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সে বছর ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে জগবি এবং জ্যাকসনের অন্য প্রতিনিধিরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনকে দলীয় ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান।

যদিও জাতীয় পর্যায়ে সেই প্রচেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি, তবুও ১১টি অঙ্গরাজ্যের পার্টি তাদের ইশতেহারে "ফিলিস্তিনি জনগণের নিরাপত্তা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারের" প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। প্রাইমারিতে জ্যাকসনের সাফল্যের ফলে টেক্সাসের আরব-আমেরিকান অ্যাক্টিভিস্ট রুথ অ্যান স্ক্যাফ ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটিতে (DNC) নিয়োগ পান, যা ছিল দলের নির্বাহী পর্ষদ।

সে সময় স্ক্যাফ তার ফিলিস্তিন-পন্থী অবস্থানের জন্য ইহুদি-বিদ্বেষের ভিত্তিহীন অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন, এমনকি তাকে কমিটি থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও উঠেছিল। আল জাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে স্ক্যাফ বলেন, তিনি টেক্সাসের হিউস্টন থেকে আসা একজন সাধারণ সংগঠক ছিলেন, কোনো উচ্চ-পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, জ্যাকসন আরব-আমেরিকান কমিউনিটিকে যেভাবে আপন করে নিয়েছিলেন, তা তার এই বার্তারই প্রতিফলন ছিল যে—তিনি ক্ষমতাহীন বা অবহেলিতদের ক্ষমতায়ন করতে চান। তিনি জ্যাকসনকে একজন হাস্যোজ্জ্বল ও মিশুক মানুষ হিসেবে স্মরণ করেন। স্ক্যাফ বলেন, "আমরা শিখছিলাম কীভাবে সংগঠিত হতে হয়, কীভাবে বার্তা ছড়িয়ে দিতে হয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে হয়। তিনি পুরোটা পথ আমাদের নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন।"

১৯৪১ সালে সাউথ ক্যারোলিনায় জিম ক্রো আইনের বর্ণবৈষম্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করা জ্যাকসন অল্প বয়স থেকেই নাগরিক অধিকার আদায়ে নিবেদিত ছিলেন। কিশোর বয়সেই তিনি নাগরিক অধিকার আন্দোলনের আইকন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের শিষ্য হয়ে ওঠেন।

তার জাতীয় প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একটি বৃহত্তর জোট গঠন করা, যারা একত্রিত হয়ে সমান অধিকারের দাবি তুলবে। ১৯৬৫ সালে তিনি শিকাগোতে চলে যান এবং সেখানে নাগরিক অধিকার ও কমিউনিটির ক্ষমতায়নের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে তোলেন, যা পরে 'রেইনবো/পুশ কোয়ালিশন' (Rainbow/PUSH Coalition) নামে পরিচিতি পায়।

প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের দৌড় শেষ হওয়ার পরেও জ্যাকসন আরব কমিউনিটির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। ইলিনয়ের আরব আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (AAAN) নির্বাহী পরিচালক হাতেম আবুদাইয়্যাহ জ্যাকসনের প্রশংসা করে বলেন, তিনি ছিলেন একজন "খাঁটি শিকাগোর মানুষ, আমাদেরই একজন, যিনি শিকাগোর ফিলিস্তিনি ও আরবদের জন্য রেইনবো/পুশ-এর দরজা খুলে দিয়েছিলেন।"

আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে আবুদাইয়্যাহ বলেন, "তার নেতৃত্বে কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিনো, এশীয়, আরব এবং আরও অনেক সম্প্রদায় জাতিগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে।" তিনি আরও বলেন, "ফিলিস্তিনি ও আরব কমিউনিটির সাথে দৃঢ় এবং নীতিগত সংহতি প্রকাশে তিনি কখনোই পিছপা হননি। আজ আমরা আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধুদের সাথে এবং যারা তার সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন, তাদের সবার সাথে শোক প্রকাশ করছি।"

গাজার বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন

আরব আমেরিকান সিভিল রাইটস লিগের (ACRL) প্রতিষ্ঠাতা নাবিহ আয়াদ বলেন, জ্যাকসনই প্রথম নেতাদের মধ্যে একজন যিনি জাতীয় মঞ্চে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি আরব সম্প্রদায়ের অন্যান্য ইস্যুতেও কাজ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে রিপাবলিকান গভর্নরদের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের জন্য তদবির করেছিলেন।

মিশিগানের ডিয়ারবর্ন ভিত্তিক ACRL শরণার্থীদের দুর্দশা তুলে ধরতে জ্যাকসনকে নিয়ে একটি প্যানেল আয়োজন করেছিল। আয়াদ বলেন, জ্যাকসনের বার্তা ছিল—"ন্যায়বিচার সর্বজনীন।" আয়াদ আল জাজিরাকে বলেন, "জেসি জ্যাকসনের মতো একজন মহান ব্যক্তির সান্নিধ্য পাওয়া ছিল সম্মানের, যিনি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সাধারণ মানুষ এবং অবিচার নিয়ে সত্যিকার অর্থে ভাবতেন।"

আয়াদের মতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার এই তাড়নাই জ্যাকসনকে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এমনকি এর জন্য তাকে রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হয়েছে। ২০২৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের সময় জ্যাকসনের 'রেইনবো/পুশ কোয়ালিশন' যুদ্ধবিরতির দাবিতে জরুরি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। পরবর্তীতে ওই বছর তিনি কলেজ ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিন-পন্থী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানান এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদপত্রে লেখেন যে, এই ছাত্রনেতারা "আমাদের জাতির সেরা প্রতিনিধিত্বকারী"।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'সেন্টার ফর আরব ন্যারেটিভস'-এর পরিচালক ম্যাথিউ জাবের স্টিফলার বলেন, জ্যাকসন আরব কমিউনিটিকে এমন অনুভূতি দিয়েছিলেন যে তাদের অস্তিত্ব ও গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে। তিনিও ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে কথা বলার রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন।

স্টিফলার আল জাজিরাকে বলেন, "শুধু এই কথাটুকু বলা যে—'আমি জাতীয় রাজনীতিতে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বের অধিকার সমর্থন করি'—আপনাকে উগ্রপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারত, আপনাকে কোণঠাসা করে দিতে পারত।" "মূলধারার প্রার্থীরা তাদের ইশতেহারে এই বিষয়টি রাখতে চাইতেন না, এখনো চান না। আর এ কারণেই জেসি জ্যাকসনের প্রতি মানুষের এত ভালোবাসা ছিল, কারণ তিনি ভয় পেতেন না।"

'যে কাজ চালিয়ে যেতে হবে'

জ্যাকসনের নির্বাচনী প্রচারণার পর কয়েক দশকে মার্কিন রাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গটি এখন আর আগের মতো নিষিদ্ধ বিষয় নয়। কংগ্রেস সদস্য, মেয়র এবং সেলিব্রেটিরা এখন ইসরায়েলি নির্যাতনের সমালোচনা করছেন। তবুও, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের নেতৃত্বই ফিলিস্তিনি অধিকারের প্রকাশ্য সমর্থন এড়িয়ে চলে। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও প্রধান দুই দল কঠোরভাবে ইসরায়েল-পন্থী অবস্থান নেয়। এমনকি কমলা হ্যারিসের দল তাদের কনভেনশনে কোনো ফিলিস্তিনি বক্তাকে সুযোগ দিতেও অস্বীকৃতি জানায়।

গাজায় ভয়াবহ নৃশংসতা সত্ত্বেও ইসরায়েলে মার্কিন অর্থ ও অস্ত্রের প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। উপরন্তু, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়েছে এবং বিদেশি বংশোদ্ভূত অ্যাক্টিভিস্টদের দেশত্যাগের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

মায়া বেরি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কঠিন হলেও জ্যাকসন আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে বাধা অতিক্রম করে নিজেদের শক্তি বাড়াতে হয়। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, "রেভারেন্ড জ্যাকসনের মতো মানুষের রেখে যাওয়া শিক্ষা আমাদের এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, এই কাজ আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে।"

অন্যদিকে স্ক্যাফ বলেন, জ্যাকসন চেয়েছিলেন আরব আমেরিকানরা যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় এবং তাদের বার্তা পৌঁছে দেয়। তিনি বলেন, "আমরা তখনই শক্তিশালী হব যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং আমেরিকান নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার ও দায়িত্ব পালন করব: রুখে দাঁড়াব, কথা বলব, নির্বাচনে লড়ব এবং ভোট দেব, ভোট দেব, ভোট দেব।"

সূত্র : আল জাজিরা

আরটিএনএন/এআই