প্রচণ্ড গরমে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির নাম হিট স্ট্রোক।
প্রচণ্ড গরমে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির নাম হিট স্ট্রোক। ছবি: সংগৃহীত

প্রচণ্ড গরমে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির নাম হিট স্ট্রোক। যেকোনো বয়সের মানুষ এতে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে এটি হঠাৎ করে হয় না-এর আগে শরীরে নানা সতর্ক সংকেত দেখা দেয়। এসব লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকলে সহজেই বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, স্বাভাবিক অবস্থায় শরীর ঘামের মাধ্যমে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা দেখা দিলে ঘাম কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হতে পারে। এ অবস্থায় মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সৃষ্টি হয় হিট স্ট্রোক।

এই অবস্থায় আক্রান্ত ব্যক্তি অসংলগ্ন কথা বলতে পারেন, অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন কিংবা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শরীর একেবারে ঘামহীন হয়ে যায়, হৃদ্‌স্পন্দন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে এবং লিভার, কিডনি ও মাংসপেশিতেও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

তবে এর আগেই শরীর কিছু সংকেত দেয়, যেগুলো অনেকেই অবহেলা করেন। যেমন-মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব। অনেক সময় এগুলোকে সাধারণ সমস্যা ভেবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ এগুলোই হতে পারে বিপদের পূর্বাভাস।

প্রচণ্ড গরমে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, বমিভাব বা বমি হতে পারে, মনোযোগ কমে যায় এবং অল্পতেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। অনেক সময় মনে হয় মাথা হালকা হয়ে আসছে। এছাড়া পেটে অস্বস্তি, পেশিতে টান, অতিরিক্ত ঘাম, ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া, হৃদ্‌স্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া-এসব লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

পানিশূন্যতার কারণে মুখ ও গলা শুকিয়ে যায়, প্রচণ্ড তৃষ্ণা লাগে, প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যায় এবং পরিমাণ কমে আসে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত সতর্ক হওয়া জরুরি।

চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসা অবস্থা। তাই এসব উপসর্গ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে হবে এবং ঠান্ডা জায়গায় যেতে হবে। শরীরে পানি দিতে হবে, মুখ ও মাথায় পানি ছিটাতে হবে। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া, বগল ও ঘাড়ে ঠান্ডা প্রয়োগ করা শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

অতিরিক্ত ঘামের ক্ষেত্রে লবণ মেশানো পানি, ওরস্যালাইন বা ডাবের পানি পান করা উপকারী। শরীরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং প্রয়োজনে পাখা ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা জানান, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি, কারণ তাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম। তবে যারা রোদে কাজ করেন, যেমন শ্রমজীবী মানুষ, তাদের ঝুঁকিও কম নয়।

হিট স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি। তৃষ্ণা লাগার জন্য অপেক্ষা না করে বারবার পানি খেতে হবে। গরমে চা-কফি কম খাওয়া ভালো। বাইরে গেলে সঙ্গে পানি ও ছাতা রাখা উচিত। রোদ এড়িয়ে চলা এবং হালকা, বাতাস চলাচল করে এমন পোশাক পরা উপকারী।

খাবারের ক্ষেত্রেও সচেতনতা জরুরি। পানি সমৃদ্ধ ফল, সবজি ও তরল খাবার বেশি খাওয়া উচিত। ঝোলজাতীয় খাবার ও পাতলা ডাল শরীর ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে।

তীব্র গরমে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের প্রতিও নজর রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের রোদে অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ থেকে বিরত রাখা উচিত। পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষ ও পথের প্রাণীদের জন্য পানির ব্যবস্থা করাও মানবিক দায়িত্বের অংশ।

সব মিলিয়ে, গরমে শরীরের ছোট ছোট সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দিলে হিট স্ট্রোকের মতো মারাত্মক ঝুঁকি সহজেই এড়ানো সম্ভব।