যুদ্ধের মধ্যেও রেমিটেন্সে রেকর্ড উল্লম্ফন
যুদ্ধের মধ্যেও রেমিটেন্সে রেকর্ড উল্লম্ফনছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের রেমিটেন্স প্রবাহে শক্তিশালী উল্লম্ফন দেখা গেছে। প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল মাসের প্রথম ১২ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১৪৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ১৭ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু ১২ এপ্রিল একদিনেই এসেছে প্রায় ২১ কোটি ৯০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৫ সালের এপ্রিলের প্রথম ১২ দিনে যেখানে ১০৫ কোটি ২০ লাখ ডলার এসেছিল, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। প্রতিদিন গড়ে দেশে এসেছে প্রায় ১২ কোটি ডলার, যা অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এপ্রিলে রেমিটেন্স প্রবাহের এই গতি অব্যাহত থাকলে মাস শেষে মোট রেমিটেন্স ৩৫৯ কোটি ডলার বা প্রায় ৩.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনটি হলে একক মাস হিসেবে এপ্রিল হবে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসার মাস। এর আগে গত মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৩৭৫ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছিল, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ।

চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মোট রেমিটেন্স এসেছে প্রায় ২ হাজার ৭৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে এই সময়ে রেমিটেন্স ছিল প্রায় ২ হাজার ২৮৩ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ঈদের পর সাধারণত রেমিটেন্স প্রবাহ কিছুটা কমে যায়, তবে এবার সেই ধারা দেখা যায়নি। বরং ঈদের পরও প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সত্ত্বেও রেমিটেন্স প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, যা অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাধারণত রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে প্রবাসীরা বেশি অর্থ দেশে পাঠান পরিবারের বাড়তি ব্যয় মেটাতে। চলতি বছরও সেই প্রবণতা দেখা গেছে, বিশেষ করে মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স এসেছে। শুধু মার্চেই প্রায় পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার পাঠানো হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ।

তবে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় কিছু উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। গালফ কো–অপারেশন কাউন্সিলভুক্ত দেশগুলোতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত থাকায় এই অঞ্চলের অস্থিরতা রেমিটেন্স প্রবাহে ভবিষ্যতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, যারা দেশের মোট রেমিটেন্সের বড় একটি অংশ পাঠান।

আকাশপথে সীমাবদ্ধতা, ভিসা জটিলতা এবং কর্মী চলাচলে অনিশ্চয়তার কারণে নতুন কর্মী পাঠানোর গতি অনেক জায়গায় ধীর হয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত রেমিটেন্স প্রবাহে এর সরাসরি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে। রেমিটেন্স বৃদ্ধির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার ক্রয় কার্যক্রমও রিজার্ভকে সহায়তা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও রেমিটেন্স প্রবাহে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে আপাতত পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং রেমিটেন্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যুদ্ধ, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের এই শক্তিশালী প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।