
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন Q1 জার্নাল Energy Conversion and Management: X-এ প্রকাশিত হয়েছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এই গবেষণা প্রবন্ধটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, জার্নালটির Impact Factor 7.6 এবং H-Index 46, যা এটিকে জ্বালানি গবেষণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশনার মধ্যে স্থান দিয়েছে।
প্রবন্ধটির শিরোনাম “Experimental performance investigation of flat plate solar collector based on the effect of contact materials between absorber plate and riser tube”। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে কুয়েটের এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. হাসান আলী-এর তত্ত্বাবধানে।
গবেষণা প্রবন্ধটির প্রধান লেখক (First Author) হলেন নাহিয়ান আহনাফ প্রতীক, যিনি কুয়েটের ESE বিভাগের ২০১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং বর্তমানে ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পাওয়ার টেকনোলজি (IEPT), কুয়েট-এ লেকচারার হিসেবে কর্মরত। প্রবন্ধটির সহ-লেখক হিসেবে রয়েছেন আদ্রিতা আনোয়ার, ফাহিম তানভীর, মো. জাবেদ আলম এবং মো. আকিব উল ইসলাম। গবেষণাটি মূলত নাহিয়ান আহনাফ প্রতীকের M.Sc. থিসিস গবেষণার একটি অংশ থেকে সম্পন্ন হয়েছে।
গবেষণাটিতে সৌর তাপীয় প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ফ্ল্যাট প্লেট সোলার কালেক্টর (Flat Plate Solar Collector)-এর কর্মক্ষমতা উন্নত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের কন্টাক্ট ম্যাটেরিয়ালের প্রভাব পরীক্ষামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সাধারণত absorber plate এবং riser tube-এর মধ্যকার সীমিত সংস্পর্শের কারণে তাপ স্থানান্তরের দক্ষতা কমে যায়। এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে গবেষকরা বায়ু, পানি, শুকনা বালি এবং ভেজা বালিসহ বিভিন্ন কন্টাক্ট ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে তুলনামূলক পরীক্ষা পরিচালনা করেন।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, পানি-ভিত্তিক কন্টাক্ট ব্যবস্থায় প্রচলিত সোলার কালেক্টরের তুলনায় প্রায় ৩৫.৭২% বেশি দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। নির্দিষ্ট সৌর বিকিরণের অবস্থায় এই সিস্টেমটি ৭৯৪.১৪ ওয়াট তাপ শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে, যা ভেজা বালি ব্যবহৃত সিস্টেমের তুলনায় ২১.৫৪% বেশি। অন্যদিকে উচ্চ সৌর বিকিরণের ক্ষেত্রে ভেজা বালি ভিত্তিক কালেক্টর প্রায় ২.৪৫% বেশি দক্ষতা প্রদর্শন করেছে।
গবেষণাটিতে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের পাশাপাশি একটি বিস্তারিত টেকনো-ইকোনমিক বিশ্লেষণও উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, কম খরচের কন্টাক্ট ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করলে সৌর তাপীয় সিস্টেমের Levelized Cost of Energy (LCOE) প্রায় ৭৫% পর্যন্ত কমানো সম্ভব এবং বিনিয়োগের উপর প্রত্যাবর্তন (ROI) ৪০.৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে সৌর তাপীয় শক্তি ব্যবস্থাকে আরও সাশ্রয়ী, কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণা প্রকাশ উপলক্ষে প্রফেসর ড. হাসান আলী মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, গবেষণা দলের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও একাগ্রতার ফলেই এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব হয়েছে। তিনি তার গবেষণা দলের সদস্যদের কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার জন্য অভিনন্দন জানান।
এদিকে প্রধান গবেষক নাহিয়ান আহনাফ প্রতীক জানান, এটি তার প্রথম পরীক্ষামূলক গবেষণা প্রবন্ধ যা একটি Q1 জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, তার থিসিস সুপারভাইজার প্রফেসর হাসান আলী স্যারের দিকনির্দেশনা ও গবেষণা দলের সহযোগিতা ছাড়া এই সাফল্য অর্জন সম্ভব হতো না।
গবেষণা প্রবন্ধটি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে এবং আগ্রহীরা নিম্নোক্ত DOI লিংকের মাধ্যমে বিস্তারিত পড়তে পারবেন:https://doi.org/10.1016/j.ecmx.2026.101745
কুয়েটের গবেষকদের এই সাফল্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণায় বাংলাদেশের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং সৌর শক্তি প্রযুক্তির উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



