শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লোগো
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লোগোছবি: সংগৃহীত

দেশের শিক্ষা খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে সরকার। প্রান্তিক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সব স্তরের শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত ‘মেধা’ ও ‘সাধারণ’—উভয় ধরনের বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ অর্থ পাবেন, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিক্ষাবৃত্তির হার নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রায় এক দশক পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২ এপ্রিল শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন-এর নির্দেশনায় বৃত্তির হার পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনাসভায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারের বাৎসরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে যেখানে বৃত্তি খাতে ব্যয় প্রায় ১৮৪ কোটি টাকা, তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩৬৮ কোটি ১৬ লাখ টাকায়। তবে এই ব্যয় অর্থ বিভাগের বাজেট বরাদ্দ সাপেক্ষে বাস্তবায়িত হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই উদ্যোগ শিক্ষা খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমাতে এবং মেধাবীদের উচ্চশিক্ষায় আগ্রহ বাড়াতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক পর্যালোচনাসভায় দেশের সব ধরনের শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এ লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর-কে একটি পূর্ণাঙ্গ সংশোধিত প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।

প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে মেধাবৃত্তির মাসিক হার ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ২২৫ টাকা থেকে ৪৫০ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে জুনিয়র স্তরে মেধাবৃত্তি ৪৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে (এসএসসি) মেধাবৃত্তি ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) স্তরে মেধাবৃত্তির পরিমাণ ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তি ৩৭৫ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

শুধু মাসিক বৃত্তিই নয়, বার্ষিক এককালীন অনুদানের পরিমাণও দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। প্রাথমিক স্তরে এই অনুদান ২২৫ টাকা থেকে ৪৫০ টাকায় উন্নীত করা হচ্ছে। জুনিয়র পর্যায়ে মেধাবৃত্তির জন্য ৫৬০ টাকা থেকে ১ হাজার ১২০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির জন্য ৩৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। এসএসসি পর্যায়ে মেধাবৃত্তির বার্ষিক অনুদান ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির ক্ষেত্রে ৪৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা করা হবে। একইভাবে এইচএসসি পর্যায়ে মেধাবৃত্তির অনুদান ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং সাধারণ বৃত্তির জন্য ৭৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বৃত্তির অর্থের হার অপরিবর্তিত ছিল এবং পূর্ববর্তী সরকার এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে এবং দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা নীতিগত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

এদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও তাদের আওতাধীন বৃত্তির সংখ্যা অপরিবর্তিত রেখে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ করার প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৯ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্তরে বৃত্তি পাচ্ছেন। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরে রয়েছে ৮২ হাজার ৫০০ জন, জুনিয়র পর্যায়ে ৪৬ হাজার ২০০ জন, এসএসসি পর্যায়ে ২৫ হাজার ৫০০ জন এবং এইচএসসি পর্যায়ে ১০ হাজার ৫০০ জন শিক্ষার্থী। এছাড়া উচ্চশিক্ষার বিশেষ ক্যাটাগরিতে প্রায় ৪ হাজার ৯৫৯ জন শিক্ষার্থী বৃত্তির আওতায় রয়েছেন।

সার্বিকভাবে, শিক্ষাবৃত্তির হার দ্বিগুণ করার এই উদ্যোগ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করবে না, বরং মেধাবী ও প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম করবে।